উইল সম্পর্কিত হিন্দু আইন


উইল কি এবং তার প্রকৃতি:

প্রাচীন হিন্দু আইনে উইলের কোন বিধান ছিলনা। কালের বিবতর্নে তা হিন্দু আইনে স্থান করে নেয় এবং বর্তমানে উইলের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি। এটি বৃটিশ আমলে ইংরেজদের আইনের অনুসরণে এদেশে হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত হয়েছে। "উইল" ইংরেজী শব্দ। বাংলা ভাষায় উইলের অর্থ ইচ্ছাপত্র এবং আরবিতে ওসিয়ত। সাধারণত কেউ মৃত্যু শয্যাকালে বা মৃত্যুর আগে তার সম্পত্তি কারো নামে বিলিব্যবস্থা কিভাবে হবে তা যদি কোন লিখিত দলিলমূলে করে দেন তবে তাকে উইল বলা যেতে পারে। উইলকৃত সম্পত্তি উইলদাতার মৃত্যুর পর হস্তান্তরিত হয়। দায়ভাগ হিন্দু আইন গোপীরাজকৃত বনাম রামজি পাল মোকদ্দমায় পুত্র ব্যতীত পূর্ব পুরুষাগত স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিতে হিন্দুর উইলকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। হিন্দু আইনে উইল মুসলিম আইনের উইল প্রায় অনুরূপ। পাথর্ক্য শুধু মুসলিম আইনে কোন মুসলমান তার সম্পত্তির ১/৩ অংশের বেশী কারো নামে উইল বা অসিয়ত করতে পারেনা।

মোট সম্পত্তির ১/৩ অংশের বেশী আইনতঃ উইল বৈধ নয়। পক্ষান্তরে হিন্দু আইনে উইলদাতা যে সব পরিবারবগের সদস্য ও সদস্যদের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য তাদের জন্য ভরণ-পোষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা রেখে বাকি সম্পত্তি উইল করে দিতে পারে।

১৯২৫ সালের  উত্তরাধিকার আইনের ২(জ) ধারায় উইলকে সজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে "উইল" অর্থ উইলকারীর সম্পত্তি বিষয়ে তার ইচ্ছার আইনগত ঘোষণা বুঝাইবে, যাহা তিনি তাহার মৃত্যুর পর কার্যকর হবে মর্মে ইচ্ছা পোষণ করেন।

একজন স্ত্রীধনের অধিকারিণী তার স্ত্রীধন অন্যকে উইল করে দিতে পারে, তবে স্বামীর জীবদ্দশায় অজির্ত কিছু সম্পত্তি স্ত্রীধন  উইল  করতে গেলে স্বামীর সম্মতির প্রয়োজন হয়। একজন নারীর সম্পত্তির অধিকারিণী কোন অবস্থাতেই নারীর সম্পত্তির কোন অংশ উইল করতে পারেনা। আগে অজাত ব্যক্তির বরাবরে কোন উইল করা যেতনা কিন্ত বর্তমানে শর্ত সাপেক্ষে অজাত ব্যক্তির বরাবরে উইল করা যেতে পারে।


দানপত্র এবং উইলের পাথর্ক্য:
) দান আইনত সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে কার্যকরী হয়। উইল কার্যকরী হয় উইলকারীর মৃত্যুর পর। ২) স্থাবর সম্পত্তির দানপত্র রেজেষ্ট্রী হওয়া আবশ্যক। উইল রেজেষ্ট্রী বিষয়ে কোন বাধ্যবাধকতা নাই। ৩) দান সম্পন্ন হয়ে গেলে তা আর প্রত্যাহার করা যায় না। উইল যতবার খুশী প্রত্যাহার করা যায়। ৪) একজন বিধবা স্বামীর কাছ হতে প্রাপ্ত নারীর সম্পত্তির কিছু অংশ স্বামীর মঙ্গলার্থে ধর্মীয় কাজে দান করতে পারে। নারীর সম্পত্তির কোন  অংশ কোন অবস্থাতেই উইল করা যায় না।


উইলকারীর যোগ্যতা :
মানসিকভাবে সুন্থ এবং প্রাপ্তবয়স্ক এমন যে কোন হিন্দু তার সম্পত্তি উইলের মাধ্যমে হস্তান্তর করতে পারে। ১৮৭৫ সালের আইনের ৩নং ধারা আনুসারে যে ব্যক্তি সাবালকত্ব অজর্ন করেন সে উইল করতে সক্ষম নয়। হিন্দু আইন অনুসারে, পনের বছর পূর্ণ হলে কোন ব্যক্তি সাবালক হিসেবে গণ্য হয়। [উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫ এর ধারা ৫৯  ]

 উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫

ধারা৫৯: উইল সম্পাদনে যোগ্য ব্যক্তি ।- নাবালক নয় এমন সুস্থ মস্তিস্ক প্রত্যেক ব্যক্তিই উইলের মাধ্যমে তাঁহার মাধ্যমে তাঁহার সম্পত্তির বিলি ব্যবস্থা করিতে পারিবেন ।

ব্যাখা ১ ।একজন বিবাহিত মহিলা তাঁহার জীবদ্দশায় তাঁহার নিজস্ব কাযের্র মাধ্যমে যে সম্পত্তি হস্তান্তর করিতে পারিতেন উইলের মাধ্যমে ঐ সম্পত্তি বিলি ব্যবস্থা করিতে পারিতেন ।

ব্যাখ্যা ২।বধির, বোবা বা অন্ধ ব্যক্তিগণ উইল সম্পাদনে অযোগ্য হইবেন না যদি তাহারা জানে যে তদদ্বারা তাহারা কি করিতেছে ।

ব্যাখ্যা ৩।স্বাভাবিকভাবে বিকৃত মস্তিস্ক ব্যক্তি তাঁহার সুস্থ মস্তিস্কের বিরামকালে উইল সম্পাদন করিতে পারিবেন ।

ব্যাখ্যা ৪।যদি কোন ব্যক্তি মাতাল অবস্থা কিংবা অসুস্থতা কিংবা অন্য কোন কারণে এমন মানসিক অবস্থায় থাকে যে, তিনি কি করিতেছেন তাহা তিনি জানেন না, তাহা হইলে ঐ ব্যক্তি উইল সম্পাদন করিতে পারিবেন না ।

 
উইলের মাধ্যমে হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তি:
বাংলাদেশে প্রচলিত হিন্দু আইনের একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি এই যে, একজন হিন্দু এমন কোন সম্পত্তি উইল করতে পারবে না যা সে সাধারণ দানের মাধ্যমে হস্তান্তর করতে পারেনা। এমনকি উক্ত আইন পাস হওয়ার পরেও কোন লোক তার স্ত্রীর বা অন্য কোন ব্যক্তির ভরণ-পোষন সংক্রান্ত আইনগত অধিকারকে উপেক্ষা করে স্বীয় সম্পত্তি উইলের মাধ্যমে হস্তান্তর করতে পারে না।

নিম্নলিখিত সম্পত্তি একজন হিন্দু লোক উইলের মাধ্যমে হস্তান্তর করতে পারে :

১) হিন্দু আইনের সব মতবাদ অনুসার, একজন হিন্দু লোক তার পৃথক বা স্ব-উপাজির্ত সম্পত্তি উইলের মাধ্যমে হস্তান্তর করতে পারে।

২) দায়ভাগ মতবাদ অনুসারে, পিতা উইল সম্প্দনের মাধ্যমে পৈত্রিক বা স্ব-উপাজির্ত সব ধরনের সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন। অনুরূপভাবে, একজন সহ অংশীদার যৌথ পরিবারের সম্পত্তিতে নিহিত তার সমগ্র স্বত্ব উইল করতে পারে।

৩) একজন হিন্দু মহিলা কতিপয় ক্ষেত্রে তার স্বামীর সম্মতি সাপেক্ষে স্বীয় স্ত্রীধন উইল সূত্রে হস্তান্তর করতে পারে।

৪) কোন বিশেষ প্রথার অবর্তমানে অবন্টনযোগ্য সম্পত্তির মালিক উইলের মাধ্যমে তা হস্তান্তর করতে পারেন।

অতএব দেখা যাচ্ছে যে, যেসব সম্পত্তি দানসূত্রে হস্তান্তর করা যায় কতিপয় বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতীত সেগুলোকে উইলের মাধ্যমে ও হস্তান্তর করা যেতে পারে। তবে ১৮৭০ সালের হিন্দু উইল আইন অনুসারে উইলকারী কোন ব্যক্তির ভরণ-পোষণ পাবার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সম্পত্তি উইল করতে পারে না। কাজেই উইল করার ক্ষমতা সম্পত্তির একটি নিদির্ষ্ট অংশের উপরই প্রয়োগ করা যেতে পারে।

 

অজাত ব্যক্তির বরাবরে উইল সম্পাদন :

একজন হিন্দু ব্যক্তি তার ইচ্ছা অনুযায়ী যে কোন লোকের বরাবরে স্বীয় সম্পত্তি উইল সূত্রে হস্তান্তর করতে পারে। কিন্ত যে ব্যক্তি উক্ত  উইলের  অধীনে সম্পত্তি গ্রহণ করবে উইলকারীর মৃত্যুর সময় প্রকৃতপক্ষে কিংবা আইনের ধারণায় তার অস্বিত্ব থাকতে হবে। অর্থাত্‍ অজাত ব্যক্তির বরাবরে সম্পাদিত উইল অবৈধ হবে। ঠাকুর বনাম ঠাকুর মামলায় এই নীতিটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

অজাত ব্যক্তির বরাবরে উইল সম্পকির্ত উপরোক্ত নিয়ম ১৯১৪, ১৯১৬ ও ১৯২১সালের তিনটি আইন দ্বারা পরিবর্তিত হয়। বতর্মানে অজাত ব্যক্তির বরাবরে কোন উইল অবৈধ হবেনা। আইন তিনটিতে বলা হয় যে, ১৯২৫ সালের উত্তরাধিকার আইনের ১১২, ১১৩, ১১৪, ১১৫, ১১৬ নং ধারায় বর্ণিত সীমাবদ্ধতা ও বিধান সাপেক্ষে কোন উইল অবৈধ হবেনা শুধুমাত্র এই কারণে যে, যার হিতার্থে উইল করা হয়েছে উইলকারীর মৃত্যুর সময় সে জন্মগ্রহণ করেনি। ১৯১৬ সালের ১৫ নং আইনের বিধান অনুসারে, অজাত ব্যক্তির বরাবরে কোন দান বা উইল করা হলে তা বৈধ হবে। তবে এক্ষত্রে চুড়ান্ত শর্ত প্রদান করতে হবে এবং উক্ত দানকে অবশ্যই ১৯২৫ সালের উত্তরাধিকার আইনের ১১৩নং ধারায় বর্ণিত আবশ্যকীয় শতর্সমুহ প্রদান করতে হবে।

 

উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫ এর ধারা ১১৩ অনুসারে পূবর্দান সাপেক্ষে উইলকারীর মৃত্যুর সময়ে অস্তিত্বহীন ব্যক্তির বরাবরে দান -যেক্ষেত্রে উইলকারীর মৃত্যুর সময়ে অস্বিত্ব নেই এমন কোন ব্যক্তির বরাবরে দান করা হয়, সেক্ষত্রে পরবর্তী দানটি বাতিল হবে যদি না তা উইলকৃত বস্তুতে বিদ্যমান উইলকারীর অবশিষ্ট সমুদয় স্বার্থ থাকে।

 

উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি পরিস্কারভাবে বোঝা যায় :

ক) সম্পত্তি ক কে সুশীল এর মৃত্যুর পর তার বড় পুত্রকে এবং তার মৃত্যুর পর তার বড় পুত্রকে দান করা হয়। উইলকারীর মৃত্যুর সময় সুশীল এর কোন সন্তান নাই। সুশীল এর বড় পুত্রের বরাবরে দানটি অস্তিত্বহীন ব্যক্তির বরাবরে দান হওয়ায় দানটি বাতিল হবে।

খ) ক সারাজীবনের জন্য খ-কে কিছু অর্থ উইলমূলে দান করে এবং এই মর্মে নিদের্শ দান করে যে, খ এর মৃত্যু হলে উক্ত অর্থ তার কন্যাসন্তানদের উপর এমনভাবে স্থির হবে যাতে প্রত্যেক কন্যার অংশ সারা জীবনের জন্য তার হয় এবং তার মৃত্যুর পর তার ছেলেমেয়েদের মাঝে মধ্যে বন্টিত হয়। ইলকারীর মৃত্যুকালে খ এর জীবিত কোন কন্যা থাকেনা। এক্ষেত্রে, খ এর কন্যাদের বরাবরে প্রদত্ত একমাত্র দানপত্রটি উক্ত অর্থ স্থির হওয়ায় নির্দেশের মধ্যে নিহিত, এবং এই নির্দেশ এখনো জন্মগ্রহণ করেনি এমন ব্যক্তিগণের উক্ত তহবিলে নিহিত জীবনস্বত্বের বরাবরে দান পত্রের মত হবে। খ এর কন্যাদের উপর তহবিল স্থির হওয়ার নিদের্শ বে-আইনী৷
 


[Next page]

 

© 2005 All rights reserved D.NET Bangladesh