উত্তরাধিকার প্রশ্নে ও মিতাক্ষরা ও দায়ভাগ আইনের মধ্যে গুরুতর কিছু পাথর্ক্য রয়েছে মূলতঃ
দুটো বিষয়ে এই পাথর্ক্য বা মতভেদ দেখা
যায়।
ক. সম্পত্তি বর্তানোর পদ্ধতি ও
খ. সপিন্ড তত্ব
ক. সম্পত্তি বর্তানোর পদ্ধতি:
মিতাক্ষরা আইনে
একটি পরিবারের সমস্ত পুরুষকে একত্রে পারিবারিক সম্পত্তির মালিক
ধরা হয়। একটি পরিবারের সমস্ত পুরুষকে একত্রে পারিবারিক সম্পত্তির
শরিক ধরা হয়। পরিবারের
অন্যান্য পুরুষ সদস্যদের
অনুমতি ছাড়া অপর সদস্য পারিবারিক সম্পত্তিতে তার নিদির্ষ্ট
অংশ
কোনভাবেই বিক্রি বা হস্তান্তর করতে
পারে না। পরিবারের একজন পুরুষ সদস্য মারা গেলে
তার সম্পত্তি তার পরিবারের সমস্ত পুরুষের মধ্যে
সমানভাবে বন্টন হবে।
উদাহরণ: সাধন ও
শিপন দু' ভাই এবং তারা
যৌথ পরিবারভুক্ত। তাদের
পূর্বপুরুষের কাছ থেকে তারা ২০ বিঘা সম্পত্তি পায়।
পরবর্তীতে, সাধন
ওকালতি করে নিজ গ্রামে আরো ৩০ বিঘা জমি অজর্ন করে এক ছেলে রেখে মারা গেলেন। এক্ষেত্রে, সাধনের মৃত্যুর পর
পূর্বপুরুষের সম্পত্তি ২০ বিঘা জমি সাধনের ভাই শিপন ও সাধনের ছেলে
সুজিতের মধ্যে সমানভাবে বন্টন হবে। একেই বলে উত্তরজীবি সূত্রে (survivorship) সূত্রে
সম্পত্তি প্রাপ্তি। তবু, সাধনের নিজস্ব সম্পত্তি পুরোটাই
অর্থাত্ ৩০ বিঘা জমি
সম্পূর্ণভাবে সাধনের ছেলে সুজিতের উপর উত্তরাধিকার সূত্রে ন্যস্ত হবে। সুতরাং একজন
মিতাক্ষরা হিন্দু (১) উত্তরজীবি ও (২) উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি লাভ করে।
উল্লখ্য, মিতাক্ষরা আইনে যে মুহুর্ত একটি
পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সাথে সাথে সে যৌথ পরিবারের
পূর্বপুরুষ কতৃর্ক অজির্ত
সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় এবং পরিবারের কোন এক সদস্যের মৃত্যুতে সে অন্যান্য জীবিত
সহ-উত্তরাধিকারীদের সাথে সমানভাবে সম্পত্তির অংশ পায়।
অন্যদিকে, দায়ভাগ আইন, উত্তরাধিকারীদের
সম্পত্তি প্রাপ্তির শুধু একটি নিয়মই স্বীকার করে আর তা হলো উত্তরাধিকার সূত্র
৷ যেমন, ভুবন এবং মহেশ দুই ভাই এবং তাদের
পারিবারিক সম্পত্তিতে ভুবনের ১/২ অংশ ও মহেশের ১/২ অংশ৷ভুবন তার ছেলে আশীষকে রেখে
মারা গেলে মহেশের সম্পত্তির ১/২ অংশ পুরোটাই ছেলে আশীষ উত্তরাধিকার সূত্রে পাবে।
মহেশ কিন্তু ভাই ভুবনের সম্পত্তিতে কোন অংশ পাবে না। বাবার মৃত্যুতে এভাবে ছেলের
সম্পত্তি পাওয়াকে বলা যায় উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়া।
দায়ভাগা আইনে কোন কোন
ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে উত্তরজীবি সূত্রে সম্পত্তি পাওয়া স্বীকৃত:
দায়ভাগা উত্তরজীবি সুত্রে
সম্পত্তি পাওয়ার নিয়ম স্বীকার করে না, তবে দুটো ক্ষেত্রে এ নিয়মের ব্যতিক্রম আছে :
১. যদি
কোন ব্যক্তি দুই স্ত্রীকে উত্তরাধিকারিনী রেখে মারা যান, তবে দুই স্ত্রী জীবনস্বত্বে
মৃত স্বামীর সম্পত্তি পাবেন। অত:পর একজন বিধবার মৃত্যু হলে
তার সম্পত্তি অন্য বিধবা
উত্তরজীবি (survivor)
রূপে পাবেন এবং অত:পর তিনিও মারা গেলে উভয়াংশ তাদের মৃত
স্বামীর নিকটবর্তী সপিন্ডদের উপর
বর্তাবে।
উদাহরণ: প্রতাপ
তার দুই স্ত্রী শীলা ও রাণীকে রেখে মারা গেল৷ সুতরাং শীলা ও রাণী এখন প্রতাপের
সম্পত্তি ১/২ অংশ করে পাবে। কিছুদিন পরে শীলার মৃত্যু হলে রাণী তার ১/২
অংশ পাবে। আরো
কিছুদিন পরে যখন রাণীর মৃত্যু হল, তখন প্রতাপের সম্পত্তি প্রতাপের ভাই বিনোদ নিকটবর্তী সপিন্ড হিসেবে উক্ত সম্পত্তি পাবে।
২. একইভাবে, কোন
হিন্দু ব্যক্তি দুই কন্যা উত্তরাধিকারী রেখে মারা গেল এবং পরে এক কন্যা মারা গেলে
তার ১/২ আংশ আপর কন্যা উত্তরজীবি হিসেবে পাবে। উল্লেখ্য মিতাক্ষরা আইনে, পরিবারে কোন
পুত্রসন্তানের জন্মের সাথে সাথে উত্তরাধিকার সূচিত হয়। অন্যদিকে দায়ভাগা
আইনে, পরিবারে কোন ব্যক্তির মুত্যুর সাথে সাথে সম্পত্তিতে তার
উত্তরাধিকারীদের অধিকার জন্মে।
খ. সপিন্ড তত্ব
সপিন্ড
মতবাদ হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের মূল ভিত্তি। হিন্দু আইনের প্রধান উত্স স্মৃতি
শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, যারা মৃত ব্যক্তির সপিন্ড, তারা মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হবে। এই "সপিন্ড"
শব্দটির অর্থ নিয়ে পরবর্তীকালে মিতাক্ষরা মতবাদের ভাষ্যকার বিজ্ঞানেশ্বর ও
দায়ভাগা মতবাদের জীমূতবাহনের মধ্যে মতপাথর্ক্য দেখা যায়। বিজ্ঞানেশ্বরের
মতে, 'সপিন্ড' অর্থ যারা মৃত ব্যক্তির শরীর তথা রক্তের সাথে সম্পকির্ত, তারাই মৃত
ব্যক্তির ওয়ারিশ অথবা উত্তরাধিকারী হবে। পক্ষান্তরে, জীমুতবাহনের মতে, সপিন্ডের
অর্থ মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধে যারা শ্রাস্তমতে পিন্ডদানের অধিকারী, তারাই মৃত ব্যক্তির
সপিন্ড। অর্থাত্ মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার যোগ্য।
[Next page]