শ্রম আদালত
শ্রমক্ষেত্রে শ্রমিকদের সমস্যা বা জটিলতার সমাধান ট্রেড ইউনিয়ন বা অন্যভাবে অনেক
সময় সহজেই মিটিয়ে ফেলা সম্ভব মনে হলেও বাস্তবক্ষেত্রে অনেক সময় তা সম্ভব হয় না৷
সেক্ষেত্রে তা মামলা মোকাদ্দমা পর্যন্ত গড়ায় ৷ আবার অনেক সময় শ্রমিক জানেও না যে
কোথায় গেলে তিনি তার কাংখিত প্রতিকার পেতে পারেন৷
আমাদের
দেশে আইন সৃষ্ট বিভিন্ন আদালত রয়েছে৷ দেওয়ানী বিচার কার্যে সহকারী জজ, সিনিয়র
সহকারী জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ ও জেলা জজের আদালত রয়েছে৷ তেমনি ফৌজদারী কার্যক্রমে ৩
য় শ্রেণীর মেজিস্ট্রেট, ২য় শ্রেণীর মেজিস্ট্রেট, ১ম শ্রেণীর মেজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত
জেলা মেজিস্ট্রেট, জেলা মেজিস্ট্রেট, মেট্রোপলিটন মেজিস্ট্রেট, চীফ মেট্রোপলিটন
মেজিস্ট্রেট, সহকারী দায়রা জজ, অতিরিক্ত দায়রা জজ ও দায়রা জজের আদালত রয়েছে যেমন
পারিবারিক আদালত, শ্রম আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন বিষয়ক আদালত, অর্থ ঋণ আদালত, কর
ট্রাইব্যুনাল, ইত্যাদি৷ শ্রম আদালত শ্রম আইন দ্বারা একটি বিশেষ শ্রেণীর আদালত৷
শ্রম
আদালতে যেসব মামলা হয়ে থাকে সেগুলির মধ্যে ছাটাইকৃত, বরখাস্তকৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত
এবং টার্মিনেশনকৃত শ্রমিকগণের মামলা বেশী৷ তারা তাদের কাজে পূনবহালের প্রার্থনা
নিয়ে আদালতে এসে থাকেন৷ এছাড়া বকেয়া মজুরীর দাবী নিয়ে এবং আইনগত অধিকার বলবত্ বা
কার্যকরী করার প্রার্থনা নিয়েও প্রচুর শ্রমিক শ্রম আদালতে আসেন৷
শ্রম আদালতের গঠন
১৯৬৯ সনের শিল্প সম্পর্কিত অধ্যাদেশের ৩৫(২) ধারানুযায়ী শ্রম আদালত গঠিত হয়ে থাকে৷
উক্ত আইনের ৩৫ ধারায় বলা হয়েছে-
উপধারা (১) সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে নিজের বিবেচনায় যতগুলো শ্রম আদালত
প্রয়োজন ততগুলো শ্রম আদালত প্রতিষ্ঠিত হলে এ অধ্যাদেশের অধীনে এদের প্রত্যেকের
ক্ষমতাভুক্ত এলাকা সরকারী গেজেটে প্রকাশ করবেন৷
(২) সরকার কর্তৃক নিযুক্ত একজন চেয়ারম্যান এবং চেয়ারম্যানকে পরামর্শ প্রদানের
উদ্দেশ্যে নির্ধারিত পদ্ধতিতে দু'জন সদস্য নিযুক্ত হবে৷ এদের একজন মালিক পক্ষের এবং
অপরজন শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করবেন৷
(৩) কেবল হাইকোর্টের জজ বা অতিরিক্ত জজ অথবা জেলা জজ বা অতিরিক্ত জেলা জজ পদে
অধিষ্ঠিত ছিলেন বা আছেন কিংবা অনুরূপ পদে নিযুক্তির যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ ছাড়া
অন্য কোন ব্যক্তি চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ লাভের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না৷
(৪) নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসারে মালিক পক্ষের বা শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনাক্রমে
সদস্যগণকে নিয়োগ করতে হবে৷
(৫) শ্রম আদালত -
(ক) অত্র অধ্যাদেশ মোতাবেক এর নিকট আনীত বা প্রেরিত শিল্প বিরোধের বিচার এবং
সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন;
(খ) মীমাংসার শর্তসমূহ কার্যকরকরণ অথবা ভংগকরণ সংক্রান্ত যে কোন বিষয় সরকার উত্থাপন
করলে সে সকল বিষয়ে তদন্ত ও বিচার করবেন;
(গ) অত্র অধ্যাদেশের অধীনে কৃত অপরাধের বিচার করবেন এবং সরকার কর্তৃক সরকারী গেজেটে
বিজ্ঞপ্তি মারফত নির্দিষ্ট অন্য যে কোন আইনের অধীনে কৃত অপরাধের বিচার করবেন;
(ঘ) অত্র অধ্যাদেশের দ্বারা বা অধ্যাদেশের অধীনে অথবা অন্য যে কোন আইনের অধীনে
ন্যস্ত বা প্রাপ্ত অন্য যে কোন ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন।
(৬) ১৯২৩ সনের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ আইনের (১৯২৩ সনের ৭ নং আইন) অথবা ১৯৩৬ সনের
মজুরী পরিশোধ আইনে (১৯৩৬ সনের ৪নং আইন) যাই বলা হয়ে থাক না কেন সরকারী গেজেট
প্রজ্ঞাপনের মাধ্যম কোন শ্রম আদালতকে উপরোক্ত আইনসমূহের অধীনে যে কোন ক্ষমতা
প্রয়োগের অধিকার ন্যস্ত করে উক্ত আইনে কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করতে পারবেন এবং সংশ্লিষ্ট
আইন অনুসারে শ্রম আদালত অনুরূপ কর্তৃপক্ষ বিবেচিত হবেন এবং উক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ
করবেন।
(৭) শ্রম আদালতের যে কোন সদস্য যদি আদালতে কোন অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকেন অথবা অন্য
কোন কারণে উপস্থিত হতে অক্ষম হন তা হলেও আদালতের কাজ অব্যাহতভাবে চলতে পারবে এবং
সদস্যের অনুপস্থিতিতে আদালত তা সিদ্ধান্ত বা রোয়েদাদ প্রদান করতে পারবেন এবং
কেবলমাত্র কোন সদস্যের অনুপস্থিতির অজুহাতে আদালতের কোন কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত বা
কোন রোয়েদাদ বাতিল হবে না বা এর বৈধতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা যাবে না৷
এখানে
লক্ষনীয় যে ৩৫(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে, শ্রম আদালতের কোন সদস্য যদি আদালতের কোন
অধিবেশনে অনুপস্থিত থাকেন অথবা কোন কারণে উপস্থিত হতে অক্ষম হন তাহলেও আদালতের কাজ
অব্যাহতভাবে চলতে পারবে৷ অর্থাত্ প্রথমে আদালত মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের
প্রতিনিধির উপস্থিতিতে চেয়ারম্যানের সমম্বয়ে গঠিত হবার পর যদি কোন সদস্য অনুপস্থিত
থাকেন, সেক্ষেত্রে আদালতের কাজ অব্যাহতভাবে চলতে পারবে৷
উপরোক্ত
আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, শ্রম আদালত গঠন হয়ে থাকে একত্রে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের
সদস্যের উপস্থিতিতে৷ কোন একটি নূতন মামলা আদালত গঠিত না হলে (অর্থাত্ চেয়ারম্যান
এবং মালিক ও শ্রমিক পক্ষের সদস্যের উপস্থিতি না থাকলে) শুনানী অনুষ্ঠিত হবে না৷ তবে
উপরোল্লেখিত হাইকোর্টের বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে একবার একটি মামলায় শ্রম আদালত
গঠিত হলে (অর্থাত্ তিন সদস্যের অনুপস্থিত সত্ত্বেও) পরবর্তীতে শুনানীর দিন সদস্যের
অনুপস্থিতিতেও মামলার কাজ চলতে পারে৷
শ্রম আদালতের ক্ষমতা ও কার্যাবলী
শ্রম আদালত কিভাবে কাজ করবে সে সম্পর্কে ১৯৬৯ সালের শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশের ৩৬
ধারায় বলা হয়েছে-
(১) অত্র অধ্যাদেশের বিধানসাপেক্ষে শ্রম আদালত যতদূর সম্ভব ১৮৯৮ সনের ফৌজদারী
কার্যবিধিতে (১৮৯৮ সনের ৫নং আইন) বর্ণিত সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি অনুসরণ করবেন৷
(২) শিল্প বিরোধের বিচার ও নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে শ্রম আদালত দেওয়ানী আদালত হিসেবে
গন্য হবেন এবং নিম্নোক্ত ক্ষমতাসমূহসহ ১৯০৮ সনের দেওয়ানী কার্যবিধি আইনে (১৯০৮ সনের
৫নং আইন) ঐ আদালতকে যেসমস্ত ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তার সব ক্ষমতাই শ্রম আদালতের বেলায়
প্রযোজ্য হবে:
ক) কোন ব্যক্তির আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং শপথনামা পাঠ করিয়ে তার স্বাক্ষ্য
গ্রহণ করা;
খ) দলিলপত্র ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আদালতে হাজির করতে বাধ্য করা এবং
গ) সাক্ষী ও দলিলপত্র পরীক্ষার উদ্দেশ্যে কমিশন নিয়োগ করা এবং
ঘ) আদালতের সমীপে কোন পক্ষ উপস্থিত হতে ব্যর্থ হলে সেক্ষেত্রে একতরফা সিদ্ধান্ত
দেয়া৷
(৩) অধ্যাদেশের অধীনে অপরাধ বিচারের সময় শ্রম আদালত ১৮৯৮ সনের ফৌজদারী কার্যবিধির
(১৮৯৮ সনের ৫ নং আইন) অধীনে প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের সমান ক্ষমতা ভোগ
করবেন এবং প্রদত্ত দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপীল করার সময় একে উক্ত কার্যবিধির অধীনে
দায়রা আদালত হিসেবে গণ্য করতে হবে৷
(৪) শ্রম আদালতে মামলা দায়ের ও রেকর্ডপত্র বা দলিল দস্তাবেজ একজিবিট করার জন্য বা
কোন দলিল গ্রহণ করার জন্য কোন কোর্ট ফি দিতে হবে না৷
উপরোক্ত বিধান থেকে এটা পরিলক্ষিত হয় যে, শ্রম আদালত একই সাতে দেওয়ানী ও ফৌজদারী
উভয়বিধ কাযক্রমই পরিচালনা করতে পারে৷ ফৌজদারী কার্যবিধি মোতাবেক প্রথম শ্রেণীর
ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রদত্ত সমস্ত ক্ষমতাই শ্রম আদালতের রয়েছে৷ কিন্তু এই আদালতের কোন
দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপীল করার উদ্দেশ্যে এটিকে কার্যবিধির দায়রা আদালত হিসেবে গণ্য
করা হয়ে থাকে৷
শ্রম আদালতের রোয়েদাদ ও সিদ্ধান্ত
শ্রম আদালতের রোয়েদাদ বা সিদ্ধান্ত কিভাবে দিবে সে সম্পর্কে অধ্যাদেশের ৩৭ ধারায়
বলা হয়েছে-
১) শ্রম আদালতের রোয়েদাদ বা সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে আদালতে প্রকাশ্য ঘোষণা করতে হবে
এবং এর দু'টি কপি সাথে সাথে সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিতে হবে৷
১(ক) বিরোধে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহ লিখিতভাবে সময়সীমা বর্ধিত করার সম্মতি না দিলে
প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রম আদালতকে মামলা দায়ের করার দিন থেকে ষাট দিনের মধ্যে রোয়েদাদ
বা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করতে হবে৷ শর্ত থাকে যে রোয়েদাদ বা সিদ্ধান্ত কেবলমাত্র
বিলম্বের জন্য বাতিল হবে না৷
(২) সরকার উক্ত রোয়েদাদের বা সিদ্ধান্তের কপি পাওয়ার এক মাসের মধ্যে তা সরকারী
গেজেটে প্রকাশ করবেন৷
(৩) উপধারা (১) অনুসারে প্রদত্ত রোয়েদাদের দ্বারা কোন পক্ষ বিক্ষুদ্ধ হলে রোয়েদাদ
প্রদানের ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আপীল ট্রাইবু্যনালে আপীল আবেদন পেশ করতে পারবেন এবং
উক্ত আপীলের ব্যাপারে ট্রাইবু্যনালের সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে৷
(৪) অত্র ধারার (৩) উপধারায় উলি্লখিত রোয়েদাদ এবং ধারার (৩) উপধারায় উলি্লখিত
দন্ডাদেশ ছাড়া শ্রম আদালতের সমস্ত সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে এবং এর
বিরুদ্ধে অন্য কোন আদালতে বা কর্তৃপক্ষের নিকট আপীল করা যাবে না৷ অথবা এর বিরুদ্ধে
অন্য কোন আদালতে বা কর্তৃপক্ষ সমীপে কোন ভাবেই কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না৷
যদিও এই আইনের ৩৭(১)(ক) ধারায় শ্রম আদালতে একটি মামলা দায়েরর দিন থেকে ৬০ দিনের
মধ্যে সিদ্ধান্ত প্রকাশ করার বিধান রাখা হয়েছে কিন্তু উপশর্তে বলা হয়েছে যে, ৬০
দিনের বেশী সময় লাগলেও শ্রম আদালতের কোন সিদ্ধান্ত বাতিল হবে না৷ উপধারা ৩ অনুযায়ী
এই আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনালে আপীল করা যাবে৷
শ্রম আপীল ট্রাইব্যুনাল
১৯৬৯ সনের শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশের ৩৮ ধারায় বলা হয়েছে -
(১) একজন সদস্য নিয়ে এ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হবে৷ সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের
মাধ্যমে সরকার তাকে নিয়োগ করবেন৷
(২) যিনি কোন হাইকোর্টের জজ (অথবা অতিরিক্ত জজ) পদে বহাল আছেন বা ছিলেন এমন এক
ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালের সদস্য হবেন এবং তাঁর নিয়োগের শর্তাদি সরকার নির্ধারণ করবেন৷
(৩) ট্রাইব্যুনাল তাঁর কাছে পেশকৃত আপীল বিবেচনার পর শ্রম আদালতের রোয়েদাদ বহাল
রাখতে বা বাতিল করত কিংবা সংশোধন বা রদবদল করতে পারবেন এবং অন্য কোন বিকল্প না
থাকলে এ অধ্যাদেশের যাবতীয় ক্ষমতা আদালতের উপর প্রয়োগ করতে পারবেন৷ ট্রাইব্যুনালের
সিদ্ধান্ত আপীল দায়ের করার ৬০ দিনের মধ্যে, যত শীঘ্র সম্ভব প্রদান করতে হবে; তবে
শর্ত থাকে যে, বিলম্ব হওয়ার কারণে এর কোন সিদ্ধান্ত অসিদ্ধ হবে না৷
(৪) যেরূপ নির্ধারণ করা হবে ট্রাইব্যুনাল সেরূপ কার্য পদ্ধতি অনুসরণ করবেন৷
(৫) ট্রাইব্যুনাল তাঁর নিজের অথবা আপীল এখতিয়ারের অধীনস্থ কোন শ্রম আদালতের
কর্তৃত্বের অবমাননা করা হলে তার দন্ড দিতে পারবেন এবং এ ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল
হাইকোর্টের সমান মর্যাদা ভোগ করবেন৷
(৬) উপধারা (৫) অনুসারে ট্রাইব্যুনাল কোন ব্যক্তিকে যে কোন মেয়াদের কারাদন্ড অথবা
৫০ টাকার বেশী অর্থদন্ড প্রদান করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হাইকোর্টে আপীল করতে পারবেন৷