|
|
| |
|
| |
জাতীয় নারী
উন্নয়ন নীতি '৯৭ পরিবর্তনের তাত্পর্য
হেনা দাস
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৯৭ সালের ৮ মার্চ সর্বপ্রথম একটি জাতীয় নারী উন্নয়ন
নীতি ঘোষণা করা হয়৷ নারী সমাজের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নারীর মানবাধিকার ও
নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লড়াই-সংগ্রামের মাঝেই এই নীতি
ঘোষণার পটভূমি বিস্তৃত রয়েছে৷
ঊনবিংশ শতাব্দীতে এদেশে রাজা রামমোহন রায় ও
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নারীবিরোধী কুপ্রথার অবসান ও নারীশিক্ষা বিস্তারের
আন্দোলনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম শুরু হয় নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন৷ এরপর বেগম
রোকেয়ার আবির্ভাব ঘটে৷ তিনি নারীর মানবাধিকার, নারী-পুরুষের বৈষম্যের অবসান ও নারীর
অবরোধ মুক্তির লড়াই এবং নারীশিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে বাংলার নারী সমাজ বিশেষভাবে
মুসলিম নারী সমাজে ব্যাপক এক গণজাগরণ সৃষ্টি করেন৷ এরই পাশাপাশি ব্রিটিশবিরোধী
স্বাধীনতা সংগ্রামে নারী সমাজ ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে রাজনীতি সচেতন হয়ে
ওঠেন৷
দেশভাগের পর ভাষা আন্দোলন, গণঅভু্যত্থান ও মুক্তিযুদ্ধে নারী সমাজের প্রশংসনীয়
ভূমিকা এদেশের ইতিহাসকে আরো সমৃদ্ধ করে৷ স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলনেও নারী সমাজ
পালন করে বলিষ্ঠ ভূমিকা৷
এদিকে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনে
সৃষ্টি হয় নতুন গতি৷ এতে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর ছিল বিশেষ অবদান৷
সত্তর, আশি ও নব্বই-এর দশকে নারী আন্দোলনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ছিল অনন্য সাধারণ
ভূমিকা৷ '৭৫ এ বিশ্ব নারী বর্ষ৷ '৭৫-৮৫ বিশ্ব নারী দশক পালন, '৭৯ তে নারীর বিরুদ্ধে
সকল প্রকার বৈষম্য অপনোদন সংক্রান্ত দলিল প্রকাশ (সিডো),'৭৫ থেকে '৯৫ পর্যন্ত পরপর
চারটি বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠান ও কর্মমুখী সিদ্ধান্তগ্রহণ বিশ্ব নারী আন্দোলনের
ইতিহাসে উলে-খযোগ্য কয়েকটি মাইল ফলক৷ সর্বশেষ '৯৫-এ বেজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব
নারী সম্মেলনে ১২টি ইসু্যভিত্তিক যে কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে সেটি পরবতর্ীতে
আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করেছে৷ এখন দেশে দেশে চলছে ওই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের
সংগ্রাম৷
উল্লেখ্য, নব্বই-এর দশকে ভিয়েনা সম্মেলনের প্রত্যেকটিতে নারীর মানবাধিকার
প্রতিষ্ঠা ও নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টি বেগম রোকেয়া যুগের প্রভাব থেকে শুরু করে
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নারী আন্দোলনের মুখে যেসব দাবি ও
সুপারিশমালা উচ্চারিত হয় এবং ১৯৯৫-এ ৪র্থ নারী সম্মেলনে ১২টি ইসু্য সমন্বিত যেসব
কর্মসূচি ও কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়, তারই আলোকে 'জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি'৯৭ প্রণীত
হয়েছিল৷ নারী সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি, সুপারিশ ও আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটেছিল
'৯৭-এর জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে৷ তাই এই নীতির দলিলকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদসহ
দেশের প্রায় সকল নারী সংগঠন ও মানবাধিকার সংগঠন অভিনন্দন জানিয়েছিল এবং এই
নীতিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের প্রত্যাশায় সংগ্রামে তত্পর ছিল৷
কিন্তু অত্যন্ত
বিস্ময় ও ক্ষোভের বিষয় হলো এই যে, আকস্মিকভাবে ২০০৫ সালের মার্চ-এপ্রিলের দিকে
আমাদের হাতে এলো একটি পরিবর্তিত নতুন 'জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি'র মুদ্রিত কপি যা
কিনা প্রায় এক বছর আগে ২০০৪-এর মে মাসে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে৷ আমরা ভেবে অবাক
হই যে, কেন এবং কিভাবে অত্যন্ত চুপিসারে ও গোপনে '৯৭-এর জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি
বাতিল করা হলো এবং প্রায় এক বছর সংশ্লিষ্ট নারী সমাজের কাউকে জানতে না দিয়ে বিষয়টি
সম্পূর্ণ ধামাচাপা দিয়ে নারী উন্নয়ন নীতির পরিবর্তন করা হলো, আরো লক্ষ্য করার বিষয়
এই যে, ২০০৫ পর্যন্ত জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সভায় পেশ করা হয়েছে সেগুলোতেও
'৯৭-এর নারী উন্নয়ন নীতির রেফারেন্স টানা হয়েছে৷ পরিবর্তিত নীতির কথা উলে-খ করা হয়
নি, তখনো এটা
ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে৷ কেন এত লুকোচুরি ? এবার দেখা যাক '৯৭-এর নারী
উন্নয়ন নীতির কোথায় কি পরিবর্তন করা হয়েছে৷
(১) জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পটভূমির অংশটুকু সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে৷ (পৃ.৩-১০)৷
(২) '৯৭-এর জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির ১৪ পৃষ্ঠায় ৭ ধারার ২ উপধারায় ছিল 'অর্থনৈতিক
নীতি (বাণিজ্যনীতি, মুদ্রানীতি, করণীতি প্রভৃতি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারীর সমান
অধিকার নিশ্চিত করা৷ পরিবর্তিত নীতির ১০ পৃষ্ঠায় ৭ ধারার ২ উপধারাতে সমান অধিকারের
পরিবর্তে 'সংবিধানসম্মত অধিকার' বলা হয়েছে৷
(৩) ১৪ পৃষ্ঠার ৭ ধারাতে 'নারীর সমঅধিকার' নিশ্চিত করার পরিবর্তে 'সংবিধানসম্মত
অধিকার' বলা হয়েছে৷
(৪) ১৪ পৃষ্ঠার ৭ ধারার ৫ উপধারায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া থেকে
অংশীদারিত্ব কথাটি বাদ দেওয়া হয়েছে৷
(৫) 'সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীর সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া'
বিষয়টির তালিকা থেকে 'উত্তরাধিকার' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে৷
(৬) ১৫ পৃষ্ঠার ৭ ধারা ২ উপধারা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষে জরুরি বিষয়াদির
তালিকা থেকে 'উত্তরাধিকার' শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে৷
(৭) ১৬ পৃষ্ঠার ৮ ধারায় ছিল- জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনে চলতি সময়সীমা শেষ হবার পর
২০০১ সালে বর্ধিত সংরক্ষিত আসনে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উদ্যোগ
নেয়া৷
এখান থেকে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন কথাগুলো বাদ দিয়ে নিম্নোক্তভাবে পরিবর্তন করা
হয়েছে৷
'জাতীয় সংসদে নারীদের অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধিসহ
অন্যান্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা৷
এতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রত্যক্ষ
ভোটে নির্বাচনের দাবিতে নারী সমাজ যে আন্দোলন করে আসছেন সেই আন্দোলনের দাবিকে
অস্বীকার করা হচ্ছে, তাছাড়া ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারও লঙ্ঘন করা হচ্ছে৷
(৮) ১৬ পৃষ্ঠার ৮ ধারায় আরো ছিল-
'সিদ্ধান্তগ্রহণের সর্বোচ্চস্তর মন্ত্রী পরিষদে প্রয়োজন সংবিধানের সংশি-ষ্ট ধারার
অধীনে উলে-খযোগ্য সংখ্যক নারী নিয়োগ করা৷' এখন 'সর্বোচ্চ স্তর মন্ত্রী পরিষদ'
কথাটির বদলে 'সর্বস্তরে' কথাটি লেখা হয়েছে৷
(৯) ১৭ পৃষ্ঠার ৯ ধারার ৭ উপধারায় ছিল- 'সরকারের নীতি নির্ধারণী পদসহ সিদ্ধান্ত
গ্রহণের সকল স্তরে নারীর সম ও পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শতকরা ৩০ ভাগ
(৩০%) পদে নারী নিয়োগের উদ্দেশে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা৷' এটি পরিবর্তন করে বলা
হয়েছে- 'নারীর অধিকতর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমানে প্রচলিত কোটা
পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধির উদ্দেশ্য উদ্যোগ গ্রহণ করা করা৷'
(১০) ৯ ধারার ২ উপধারায় ছিল- 'বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে রাষ্ট্রদূতসহ
বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশন, পরিকল্পনা কমিশন, বিচার বিভাগের উচ্চপদে নারীর
নিয়োগ প্রদান করা'৷ পরিবর্তিত নীতিতে এই উপধারাটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে৷
পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করলে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, এগুলো হচ্ছে একেবারে মৌলিক ধরনের
পরিবর্তন, কেবলমাত্র কিছু শব্দ বা কাজের পরিবর্তন নয়৷ মূল আক্রমণ এসেছে নারীর
সমঅধিকার, সমান অংশীদারিত্ব, সম ও পূর্ণ অংশগ্রহণ প্রভৃতিতে এক কথায় নারী-পুরুষের
সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার মৌলিক ধারণার ওপর৷ সমঅধিকারের পরিবর্তে স্থান পেয়েছে
সংবিধানসম্মত অধিকার৷ সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর নারীর সম উত্তরাধিকারের সুযোগকে বাতিল
করে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে৷
রাষ্ট্রের উচ্চতম প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চপদে নারী নিয়োগের উপধারাটি বাতিল করে নারীর
ক্ষমতায়নের পথটিকেই বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে৷ সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রত্যক্ষ
নির্বাচনের বিধান বাতিল করে গণতন্ত্রের পরিপন্থী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং নারী
সমাজের বিরুদ্ধে বৈষম্য আরোপ করা হয়েছে৷ এটা এখন স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ২০০৪-এর
মে মাস মুদ্রিত পরিবর্তিত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিটি প্রকৃতপক্ষে একটি
প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদপসরণ, নারী উন্নয়ন ও নারীমুক্তির সম্পূর্ণ পরিপন্থী৷ এখন আমরা
বুঝতে পারছি কেন নারী সংগঠনগুলোর সাথে কোনো আলোচনা না করেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে৷
শুধু নারী
সংগঠনই নয়, জাতীয় সংসদ, মন্ত্রীপরিষদ বা সংসদীয় কমিটিতেও এই পরিবর্তন নিয়ে কোনো
আলোচনা হয়েছে বলে আমরা শুনিনি৷ এটা কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের লক্ষণ নয়, তাছাড়া এটাও
এখন স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রায় এক বছর এই পরিবর্তনের দলিলটিকে কোনো ধামাচাপা দিয়ে রাখা
হলো৷ এমনকি যদি নারী নেত্রীরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে দলিলটি উদ্ধার না করতেন তাহলে
এখনো হয়তো এটা চাপাই থাকত৷ আমার ধারণা যারা এই পরিবর্তিত দলিলের মূল প্রণেতা তারা
হয়তো নিজেদের মানেই বুঝতে
পেরেছেন যে কাজটি তারা ভাল করেন নি এবং এটি প্রকাশ পেলে ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়ে
দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে, তারা নারী সমাজের প্রচণ্ড ক্ষোভের মুখে পড়বেন৷ ঘটেছেও তাই৷
নারী সমাজ তথা নারী সংগঠনগুলো বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে৷ যদিও এখনো পর্যন্ত সারা দেশে
প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত এই দলিলের প্রচার পেঁৗছেনি৷
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কারা এই
পরিবর্তনের মূল হোতা ও উদ্যোক্তা, কারা রয়েছে এর নেপথ্যে? পরিবর্তনের এই ভয়ঙ্কর
প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্রকে রুখতে হলে নেপথ্যের এই অপশক্তিকে চিহ্নিত করা প্রয়োজন৷
দলিলটি পড়ার পর সহজেই ধারণা করা যায় যে ক্ষমতাসীন জোটের যে অংশটি কট্টর রক্ষণশীল
এবং নারীকে হেয় দৃষ্টিতে দেখেন, যারা নারীকে আবার ফিরিয়ে নিতে চান চারদেয়ালের
অভ্যন্তরে অবরুদ্ধ অবস্থায় যারা নারীর ক্ষমতায়ন চান না, নারী-পুরুষের বৈষম্যকে
জিইয়ে রাখতে চান৷ তাদের কারো কারো কলমের ছোঁয়া লেগেছে এই পরিবর্তনের দলিলে৷
আমরা
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বিশেষভাবে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা
জিয়ার কাছে এই পরিবর্তন সম্পর্কে তাদের
বক্তব্য দাবি করি৷
এই হীন কাজটি এত চুপিসারে করা হয়েছে যে, আমরা বুঝতেই পারিনি কখন
এটা ঘটলো৷ হঠাত্ আমরা অবিষ্কার করলাম যে, ১৯৯৭-এর জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির মাধ্যমে
আমরা যা কিছু মানবাধিকার ও সমঅধিকারের নিশ্চয়তা পেয়েছিলাম তার সবই ছিনতাই হয়ে গেছে৷
'৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ও গণহত্যার দোসরদের সাথে নিয়ে যারা সরকার পরিচালনা করছেন
তাদেরকে এবং তাদের সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, তারা এর মধ্যে যে সব
আন্তর্জাতিক দলিলে স্বাক্ষর করেছেন যেমন- 'সিডো' দলিল, '৯৫-এ বেজিং-এ অনুষ্ঠিত ৪র্থ
বিশ্বনারী সম্মেলনে গৃহীত কর্মসূচি ও কর্মপরিকল্পনা (যাতে ১৮৯টি দেশ স্বাক্ষর
করেছে), পরিবর্তিত জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি সেই সব আন্তর্জাতিক দলিলের সমঅধিকারের
ধারণারও পরিপন্থী৷ এতে স্বাক্ষরের মাধ্যমে যে অঙ্গীকার ঘোষণা করা হয়েছিল সেই
অঙ্গীকারও ভঙ্গ করা হয়েছে৷ এমনকি আমাদের রাষ্ট্রীয় সংবিধানে (১৯৭২ সালে ঘোষিত) ধারা
২৭, ২৮ (১), ২৮ (২), ২৮ (৩), ২৮ (৪), ২৯ (১), ৬৫ (৩) নারীর মানবাধিকার ও সমঅধিকার
যে নিশ্চয়তা রয়েছে, এই পরিবর্তন করা দলিলে তা লঙ্ঘন করা হয়েছে৷ আমাদের সংগ্রাম
নারীর পূর্ণ মানবাধিকার, সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য৷ অতএব আমাদের দাবি
অবিলম্বে ২০০৪-এর মে-তে প্রকাশিত পরিবর্তিত জাতীয় নারী নীতি বাতিল করা হোক৷ ১৯৯৭
সালে ঘোষিত ও গৃহীত নারী উন্নয়ন নীতি পুনর্বহাল করা হোক৷
এই দাবিতে দেশব্যাপী একটি
দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া বিক্ষুব্ধ নারীসমাজ ও দেশপ্রেমিক দেশবাসীর সামনে
আর কোনো বিকল্প নেই৷ এ ব্যাপারে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ একটি সাংবাদিক
সম্মেলনের মাধ্যমে আন্দোলনের সূচনা করে৷ এরপর সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আরো একটি
সাংবাদিক সম্মেলন করে৷ একে একে অধিকাংশ নারী ও মানবাধিকার সংগঠন মাঠে নামে এবং নিজ
নিজ কর্মসূচি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যায়৷ মহিলা পরিষদ এ পর্যন্ত মানববন্ধন ও শহীদ
মিনারে ২৩ জুন বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি পালন করে৷ নতুনভাবে কর্মসূচি
গ্রহণের জন্য ১৩ জুলাই সকল নারী ও মানবাধিকার সংগঠন, সকল নারী সংগঠন ও মানবাধিকার
সংগঠন ঐক্যবদ্ধভাবে পরিবর্তিত জাতীয় নারী উন্নয়ননীতি প্রতিরোধ কমিটির ব্যানারে শহীদ
মিনারে একটি বিশাল জমায়েত শেষে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করে৷
এখন এই আন্দোলনকে আরো
দৃঢ়, সংহত ও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে৷ আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে প্রতিটি জেলার
প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত তৃণমূলে৷ আন্দোলনে বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামবো
না- এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার৷ নারীসমাজ পশ্চাদপসরণকে প্রত্যাখ্যান করে এগিয়ে যেতে
চায় প্রগতির পথে৷ নারী ক্ষমতায়ন, নারীর মানবাধিকার ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে
নারী মুক্তি অর্জনই আমাদের লক্ষ্য৷
সংগ্রহ - সাপ্তাহিক একতা, ৭ আগষ্ট ২০০৫, রোববার
|
|