বিশেষজ্ঞদের অভিমত:

 

ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম
সাবেক সভাপতি

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন

তথ্য অধিকারের যুগে সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়েছে। কিন্তু তার কোনো খসড়া কপি আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া এ আইনটি পাস হওয়ার আগে কোনো আলাপ-আলোচনা বা আইন-সংশ্লিষ্ট মহল বা সুশীল সমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়নি। সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানা গেছে, এ অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এ আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য বা প্রস্তাবনা সম্পর্কে কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। তাই এ ক্ষেত্রে মতামত প্রদান করা দুষ্কর। তবে এ আইনটির বিশেষ প্রয়োগ কোন কোন ক্ষেত্রে হবে তার সঠিক ও সতর্ক সংখ্যায়ন প্রয়োজন। এ আইনের অধীন নিষিদ্ধ সংগঠনের অপরাধ বলে বিবেচিত হবে অথচ কী কী কারণে এবং কোন কোন আপত্তিকর কাজের জন্য নিষিদ্ধ করা হবে, তার কোনো দিকনির্দেশনা নেই। অতীতেও সন্ত্রাস দমনমূলক আইন হয়েছে। কিন্তু এসব আইনের অপপ্রয়োগের প্রচুর দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ওই আইন ব্যবহার করতে দেখা গেছে। সে কারণে এ জাতীয় নতুন আইন প্রণয়ন হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও ভয় সৃষ্টি হতে পারে। তাই এসব আইন প্রণয়ন করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এটা ঠিক জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে অন্যান্য দেশেও আইন তৈরি করা হয়েছে বা হচ্ছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে আমাদের দেশেও এ ধরনের আইনের প্রয়োজন রয়েছে।

এএসএম শাহজাহান

সাবেক আইজিপি এবং
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

বর্তমানে দেশে নিত্যনতুন ধরনের অপরাধ দেখা যাচ্ছে। অপরাধ দমনে বিশেষ আইন প্রণয়নের বিকল্প নেই। নতুন সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশে একসঙ্গে অনেক অপরাধের কথা বলা হয়েছে। আইনটি সন্ত্রাস দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি। আমি ওই আইনটিকে স্বাগত জানাতে চাই, কারণ এর ভালো কিছু দিক রয়েছে। তা ছাড়া এটি একটি বিশেষ আইন; যা সব সময় সাধারণ আইনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ আইনে অপরাধ করার আগে প্রস্তুতি, পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্রের জন্য শাস্তির বিধান রাখা যেত। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থাকলে আইনটি আরও কার্যকর হতো। তবে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দূর করতে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। অপরাধ দমনে সংশ্লিষ্ট বিভাগের গবেষণা ও তদন্ত কার্যক্রমের ওপর জোর দেওয়া উচিত। এ আইনে আশ্রয়দাতাকে শাস্তির বিধান করা হলেও সহায়ক বা পরামর্শক সম্পর্কে কিছু বলা নেই। আর অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যেন এর অপপ্রয়োগ না হয়। আইন প্রণয়ন করা সহজ কিন্তু প্রয়োগ করা কঠিন। তাই এ আইনের ক্ষেত্রে যথাযথ প্রয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

 

ড· এম জহির

সংবিধান বিশেষজ্ঞ

সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, ২০০৮ নামে আইনটি সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে বেশ কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ। যেহেতু এটি একটি কঠিন আইন হবে, তাই সন্ত্রাস দূর করার ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। তবে এর অপপ্রয়োগ হলে দেশের সাধারণ মানুষ অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হবে। এ আইনে সন্ত্রাসের সংজ্ঞায় সংবিধানের বিষয়টি আসা কাম্য ছিল। তবে আইন যত বেশি হবে, এর অপপ্রয়োগের আশঙ্কাও বেশি থাকে। আমি এই নতুন আইনটি আগের সরকারগুলোর প্রণয়ন করা সন্ত্রাস দমনমূলক আইনের সঙ্গে তুলনা করতে চাই না।

 

ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ

সভাপতি

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন

সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৮ পাস করার আগে আরও আলাপ-আলোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা উচিত। আমাদের দেশে বিশেষ ক্ষমতা আইন ’৭৪ রয়েছে। যে আইনে অনেক কিছুই বলা আছে। সে ক্ষেত্রে এ জাতীয় নতুন আইন তৈরি ও প্রণয়ন করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। আইন প্রণয়ন করা বা আইন থাকা অবশ্যই ভালো। তবে তা যেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করা না হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক অধিকার কিংবা জনগণের মৌলিক অধিকার যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, সেদিকটি অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। খসড়া আইনটিতে নিষিদ্ধ সংগঠনের ওপর আরও জোর দেওয়া উচিত ছিল। সর্বোপরি এখানে মুখ্য বিষয় হচ্ছে আইনের যথাযথ প্রয়োগ। কোনোভাবেই যেন এর অপপ্রয়োগ না হয়।

 

খন্দকার মাহবুব হোসেন

সহসভাপতি

বার কাউন্সিল

সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, ২০০৮-এর মতো এ ধরনের আইন আমাদের দেশে আগেও অনেক হয়েছে। ওইসব আইন দ্বারা সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা হয়রানির শিকার হয়েছেন। বর্তমান এই আইনটিও হবে গতানুগতিক। আমাদের দেশের সরকার মনে করে, কঠিন আইন করে সন্ত্রাস বা অপরাধ দূর করা যায়। অতীতে দেখা গেছে, এর দ্বারা সন্ত্রাস দূর করার চেয়ে অপপ্রয়োগই বেশি হয়েছে। তাই আমি মনে করি, আমাদের দেশে অনেক আইন রয়েছে, প্রয়োজন সেই আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগ। আর সন্ত্রাস বা অপরাধ দূর করার জন্য পুলিশ বাহিনীকে সৎ ও দক্ষ হতে হবে। এই নতুন আইনের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে, তা আমি মনে করি না।

 

ড· শাহ্‌দীন মালিক

আইনজীবী

সুপ্রিম কোর্ট

একটি সমাজে যত বেশি ফৌজদারি আইন হয়, ওই সমাজ তত বেশি বর্বর হতে বাধ্য। আমাদের দেশের প্রচলিত আইনে শতাধিক অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর কিছু অপরাধের জন্য রয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান। এর হিসাব হয়তো কেউ বলতে পারবে না। এ ধরনের প্রেক্ষাপটে আরেকটি ফৌজদারি আইনের প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। অতীতের সরকারগুলোর সময় এ ধরনের বেশ কয়েকটি আইন করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারও ঠিক একইভাবে একই জাতীয় আরেকটি আইন করতে যাচ্ছে। নিত্যনতুন আইন করার চেয়ে বিদ্যমান আইনগুলোর সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমেই দেশ থেকে সন্ত্রাস দূর হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। সুতরাং আইনের যথাযথ প্রয়োগই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

ইনায়েতুর রহিম

সাবেক সম্পাদক

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন

এ ধরনের একটি আইন প্রণয়নের আগে ব্যাপক জনমত যাচাই করা প্রয়োজন। কেননা ইতিপূর্বে সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে একাধিক আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই আইনগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে ধর্মান্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কর্মতৎপরতা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। কিন্তু সরকার আন্তরিক হলে এবং সরকারের অভ্যন্তরের কোনো গোষ্ঠী সন্ত্রাসের আশ্রয়দাতা কিংবা মদদদাতা ও অর্থের জোগানদাতা না হলে প্রচলিত যেসব আইন বিদ্যমান আছে, তা যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে এ বিষয়ে নতুন আইনের আদৌ যৌক্তিকতা আছে কি না, সেটাও ভেবে দেখা প্রয়োজন। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, প্রচলিত আইনেই ছয়জন জঙ্গির বিচার সম্পন্ন করে তাদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা গেছে। এই ধরনের আইন অতীতের মতো অপপ্রয়োগ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।

 

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শাহীন ফজলুল করিম

সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, আইন অধিকার পাতা, ২৫.০৫.০৮