গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়

ফেব্রুয়ারি ২০০৮

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

ফেব্রুয়ারি ২০০৮

 

 

 

 

 

 

 

 

বিষয়

 

প্রথম অধ্যায়

১.

ভূমিকা

 
 

১.১

বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ  
 

১.২

বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিকল্পনাসমূহে নারীর অবস্থান  
 

১.৩

নারী ও মানবাধিকার  
 

১.৪

নারী মানবসম্পদ  
 

১.৫

রাজনীতি ও প্রশাসন  
 

১.৬

নারী উন্নয়নে সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরণ  

দ্বিতীয় অধ্যায়

২.

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য  

তৃতীয় অধ্যায়

৩.

নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ  
 

৪.

মেয়েশিশুর প্রতি সকল প্রকার সৈষম্য বিলোপ সাধন এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা  
 

৫.

নারীর প্রতি সকল নির্যাতন দূরীকরণ  
 

৬.

সশস্ত্র সংঘর্ষ এবং নারীর অবস্থা  
 

৭.

শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ  
 

৮.

ক্রীড়া ও সংস্কৃতি  
 

৯.

জাতীয় অর্থনীতির সকল কর্মকাণ্ডে নারীর সক্রিয় ও সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ  
 

১০.

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন  
 

১১.

নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন  
 

১২.

স্বাস্থ্য ও পুষ্টি  
 

১৩.

গৃহায়ণ ও আশ্রয়  
 

১৪.

নারী ও পরিবেশ  
 

১৫.

নারী ও গণমাধ্যম  
 

১৬.

বিশেষ দুর্দশাগ্রস্থ নারী  

চতুর্থ অধ্যায়

১৭.

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন কৌশল  
 

১৮.

নারী উন্নয়নে এনজিও ও সামাজিক সংগঠনের সাথে সহযোগিতা  
 

১৯.

নারী ও জেন্ডার ক্ষমতা বিষয়ক গবেষণা  
 

২০.

নারী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান  

পঞ্চম অধ্যায়

২১.

কর্মপরিকল্পনা  
 

২২.

আর্থিক ব্যবস্থা  
 

২৩.

নারীর ক্ষমতায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা  

   

 

প্রথম অধ্যায়

 

বাংলাদেশে নারীর অবস্থা

 

১. ভূমিকা    

 

বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মত বাংলাদেশেরও উন্নয়ন পরিকল্পনার আবশ্যকীয় দিক হচ্ছে দারিদ্র  বিমোচন এর মাধ্যমে উৎপাদশীলতা বৃদ্ধি ও জাতীয় উন্নয়নের পথে অনুভূত যে কোন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা। বৃহত্তর উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের অধিকার ও সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার। এ মতাদের্শের ধারাবাহিকতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আন্তরিকতার সাথে কাজ করে চলেছে।

 

ঐতিহাসিক বাসত্বতার নিরিখে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই পুরুষের তুলনায় নারীর অবস্থান পিছিয়ে রয়েছে। জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীসমাজের উন্নয়ন স্বাধীন বাংলাদেমের এক অগ্রাধিকার ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত হয় যার প্রতিফলন ঘটেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে। সংবিধানের ২৭, ২৮, ২৯ এবং ৬৫ ধারায় নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। সংবিধানের ২২৮(৪) ধারা তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর আওতায় নারীর জন্য বিশেষ সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এক সাংবিধারিক শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

 

১.১ বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ

 

নারীর রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালকে নারীবর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে। এ সময়েই অনুষ্ঠিত হয় মেক্সিকোতে প্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন, যেখানে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। ফরশ্রুতিতে দেশের বাইরে চলমান নারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে বাংলাদেশেও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৮০ সালে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত দ্বিতয়ি নারী সম্মেলনে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত নারীদশক (১৯৭৬-৮৫) এর প্রথম ৫ বছরের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়্ সমাজে বিদ্যমান নারী পুরুষের মধ্যে বিভিন্ন বৈষম্যের বিলোপ সাধনে প্রণীত জাতিসংঘের Convention on the Elimination of All Forms of Discrimination against Women (CEDAW)-এ বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে ১৯৮৪ সালে। ১৯৮৫ সালে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে তৃতীয় বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং নারী উন্নয়নের লক্ষ্যে সমতা, উন্নয়ন ও শান্তির লক্ষ্যে নাইরোবি অগ্রমুখী কৌশল (Nairobi Forward Strategy Looking) গৃহীত হয়। বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি Platform For Action (PFA)। গুরুত্বপূর্ণ এ দলিলে নারীর অনগ্রসরতার সুনির্দিষ্ট ১২টি ক্ষেত্রের আঙ্গিকে গৃহীবত্য পদক্ষেপসমূহ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের বিশেষ অধিবেশনে ৫ বছরে PFA -এর বাস্তবায়ন অগ্রগতি সম্পর্কে সরকারসমূহ নিজ নিজ দেশের অগ্রগতি তুলে ধরার পাশাপাশি পূর্ণ বাস্তবায়নের পথে অনুভূত সমস্যাবলী সম্পর্কে পারস্পরিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে সমাধানের কৌশল সম্পর্কে আলোচনা করেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের প্রায় সকল ফোরামে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জঅতিক সনদ/দলিলসমূহে স্বাক্ষরের মাধ্যমে নারী উন্নয়নে বিশ্ব ভাবধারার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত মিলোনিয়াম সামিটের অধিবেশনে বাংলাদেশ Optional Portocol on CEDAW স্বাক্ষর করে। গুরুত্বপূর্ণ এ সনদে স্বাক্ষরকারী প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে। এছাড়াও আঞ্চলিক পর্যায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সনদেও বাংলাদেশ স্বাক্ষর করে নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে বহুমুখী ব্যবস্তা গ্রহণে নিজ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।

 

১.২ বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনাসমূহে নারীর অবস্থান

 

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ৯১৯৭৩-৭৮) মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ছিন্নমূল নারীর পুনর্বাসনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। অতঃপর (১৯৭৮-৮০) দ্বিবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় মহিলা সেক্টরে অর্থ বরাদ্দ প্রদান করে নারীকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভূকত করে নারীর কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির কর্মসূচিত গ্রণ করা হয়। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও (১৯৮৫-৯০) একই কর্মসূচি গৃহীত হয়। অতঃপর চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৯০-৯৫) নারী উন্নয়নকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পক্তকরণের লক্ষ্যে আন্তঃখাত উদ্যোগ গৃহীত হয় এ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্যগুলোর প্রধান কয়েকটি খাতে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য দূর করা, দক্ষতা বৃদ্ধি করা, স্ব-কর্মস্থান ও ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণ করা, জেন্ডার সম্পর্কীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং নারীর জন্য সহায়ক সুবিধা সম্প্রসারণ, যথা কর্মজীবী মহিলাদের হোস্টেল, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, আইন সহায়তা প্রদান উল্লেখযোগ্য। পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীকে উন্নয়নৈর মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্তকরণের প্রচেষ্টাকেই আরো জোরগার করা হয় এবং নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য স্রোতধারায় সম্পুক্তকরণের প্রচেষ্টাকেই আরো জোরদার করা হয় এবং নারীর প্রতি সকল প্রকাস বৈষম্য দূরীকরণ সনদ, প্ল্যাটফরম ফর এ্যাকশন, নারী উন্নয়নে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃঢ় পরিবহন ও যোগাযোগ, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক মাইক্রো অধ্যায় গুলোতে জেন্ডার প্রেক্ষিত সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

 

সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য বিমোচন। সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারের দৃঢ় অঙ্গীকরের প্রতিফলন ঘটেছে NSAPR (National Strategy for Accelerated Poverty Reduction) এ। এ দলিলে দেশকে দ্রুত মুক্ত করার ক্ষেত্রে গৃহীতব্য কৌশলাদির বর্ণনা রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ নারীর অনগ্রসরতার বিভিন্ন দিকগুলো NASAPR গুরুত্বের সাথে চিবেচিত হয়েছে এবং গৃহীতব্য কৌশলাদি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশরা রয়েছে।

 

১.৩ নারী ও মানবাধিকার

জাতীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত সত্য যে, নারী অধিকার বলতে নারীর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন কোন সুযোগ বা অধিকার বোঝায় না। নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত প্রশ্নে নারী অধিকারের আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা যা কিছু চাওয়া হয় তার সবই নারী পুরুষ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের নাগরিক মাত্রেরই মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট। মানবাধিকারের মৌলিক এ ক্ষেত্রগুলোতে নারী যুগ যুগ ধরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ভাবেই বৈষম্যের শিকার হওয়ায় তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর অবস্থানে রয়েছে। আর সে কারণেই প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নীতিমালার মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা যা সুস্থ সমাজ তথা উন্নত রাষ্ট্রের সহায়ক শক্তি।

 

দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব প্রেক্ষাপটের নানাবিধ বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশেও নারীর মানবাধিকার সংরক্ষণের প্রশ্নে নারীর বিরুদ্ধে সকল সহিংসতা প্রতিরোধ তথা নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বলে চিহ্নিত। কোন উন্নয়ন প্রচেষ্টাই ফলপ্রসু হবে না যদি নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধ করা না যায়।

 

নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে আইনগত সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানের জন্য ১৯৯০ সালে মন্ত্রণালয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল গঠন করা হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নির্যাতিতা নারীদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে আইনজীবীর ফি ও অন্যান্য সহায়তা দানের উদ্দেশ্যে জেলা ও সেশন জজ এর অধীনে নির্যাতিতা নারীদের জন্য একটি তহবিল। এছাড়া দুঃস্থ, অসহায় ও আর্থিক দুর্দশাগ্রস্ত মহিলা ও শিশুদের আর্থিকভাবে সহায়তা প্রদানের জন্য মন্ত্রণালয়ে দুঃস্থ মহিলা ও শিশু সাহায্য তহবিল রয়েছে।

 

যৌতুক, ধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ-এ ধরণের সন্ত্রাসের কারণে কেবল ঘরের বাইরেই নয়- পরিবারে বা নিজ ঘরেও নারীর নিরাপত্তা অনেকটাই হুমকির সম্মুখীন। নারীর বিরুদ্ধে যে কোন ধরণের সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বিদ্যমান যৌতুক নিরোধ আইন ১৯৮০, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ১৯২৯, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন ২০০৩ এর পাশাপাশি ক্রমবর্ধমান এসিড সন্ত্রাসকে কঠোরভাবে দমনের উদ্দেশ্যে সরকার এসিড দমন আইন ২০০২ এবং এসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২ প্রণয়ন করেছে। এছাড়া এসিড ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটি জাতীয় এসিড নিয়ন্ত্রণ কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে।

 

নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাসমূহের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সারা দেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে। নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য এতৎসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করা হয়েছে। পুলিশের রেফারেন্স ছাড়াও ধর্ষণ এবং অন্যান্য সহিংসতার শিকার কোন নারী ও শিশু যে কোন সরকারি স্থাপনায় কিংবা সরকার কর্তৃক স্বীকৃত বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্তব্যরত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার পরীক্ষাসহ অন্যান্য জরুরী সেবা প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

১.৪ নারী মানবসম্পদ

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করাসহ টেকসই জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য দক্ষ মানবসম্পদের কোন বিকল্প নেই। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পূর্বশর্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ। আবহমান হতেই বাংলাদেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে পুরুষের তুলনায় নারী অনগ্রসর অবস্থানে রয়েছে। সে কারণে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য সেবার অনুপস্থিতিতে নারীর দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে বিকাশের পথও বাধাগ্রস্থ হয়েছে।

 

সরকার নারীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের প্রচেষ্টায় অতীতেও যেমন শিক্ষা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, সে ধারা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নারী শিক্ষা বিষয়টিকে বিশেষ প্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে যাবার লক্ষ্যে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণীর ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। এ কর্মসূচি মাধ্যমিক স্তরে ছাত্রী ভর্তির হার বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া রোধকল্পে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। সারাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত নারী শিক্ষা অবৈতনিক এবং আর্থিক সুবিধা প্রদান করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে এবং ১ জানুয়ারি ২০০২ থেকে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হচ্ছে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্রীদের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ ছাত্রীদের জন্য বৃত্তিরও ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন বৃত্তিমূলক প্রশ্কিষণের মাধ্যমে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। নারী শিক্ষা সম্প্রসারণে সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপের কারণে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে নারীর অবস্থানে ইতিবাচক প্রতিফলন ঘটেছে।

 

দারিদ্র ও সচেতনতার অভাবে নারীস্বাস্থ্য বিষয়টি দীর্ঘকাল বাংলাদেশের বিশেষত পল্লী অঞ্চলে অবহেলিত থেকেছে। পল্লী অঞ্চলে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতি চালু থাকায় আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাধীনে সেবাপ্রাপ্তি বহুকাল উপেক্ষিত থেকেছে। ফলশ্রুতিতে বেড়েছে মাতৃত্বজনিত কারণে নারী মৃত্যু তথা শিশু মৃত্যুর হার। নারীস্বাস্থ্যের গুরুত্ব বিচেনায় সরকার জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিসহ স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচি অনুমোদন করেছে। দরিদ্র নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের বিষয়টির উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপসহ সমগ্র জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই কাহীয় স্বাস্থ্যনীতির মূল লক্ষ্য। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার প্রয়াসে সরকার নারী বান্ধব হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছে।

 

১.৫ রাজনীতি ও প্রশাসন

 

সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সকল ক্ষেত্রেই নারীর অংগ্রহণ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় বিগত বছরগুলোতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিভয়টি সরকার গুরুত্বের সাথে দেখেছে। জাতীয় সংসদে মহিলাদের প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়েও নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি আজ দৃশ্যমান। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিদের সরাসরি ভোটে নির্বাচনের সুযোগ রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনসমূহে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বৃদ্ধি/সরাসরি নির্বাচনের বিষয়টি সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে।

 

অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষমতায়নের পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর সম্পৃক্ততা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারী ক্ষমতায়নের বিষয়টিতে সর্বোচ্চ মাত্রার পূর্ণতা নিশ্চিত করে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর সম্পৃক্ততা দেশের সকল নীতিমালা প্রণয়ন/সংশোধন/ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জেন্ডার প্রেক্ষিত বা জেন্ডার সংবেদনশীলতাকে অন্তর্ভুক্তকরণের ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর সম্পৃক্ততা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশে পর্যায়ক্রমে যথাযথ ব্যবস্থা গৃহীত হচ্ছে। সরকারের গৃহীত নানাবিধ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কারণে সার্বিক পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হচ্ছে। সরকারি প্রথম শ্রেণীর পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১০% পদ নারীর জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রপতির কোটায় সরাসরি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

 

এছাড়া সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসন, বিচার, পুলিশ প্রশাসন, সেনাবাহিনীসহ সকল পেশাতেই নারীর জন্য দ্বার ক্রমাগত উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং এর ইতিবাচক ফল চোখে পড়ে আজ সব ধরণের পেশাতে নারীর অবাধ পদাচারণায়। এছাড়াও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী পদে মহিলারা দক্ষতার সাথে কাজ করে আসছেন।

 

১.৬ নারী উন্নয়নে সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরণ

 

স্বাধীনতাউত্তরকালের শুরুর দিনগুলোতে মূলত যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ নারীদের বিয়টিকে বিবেচনায় রেখে গঠিত হয় নারী পনর্বাসন বোর্ড যা পরবর্তিতে রূপ নেয় নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে মহিলা বিষয়ক কোষ গঠিত হয়।

 

নারীকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করার বলিষ্ঠ প্রয়াস হিসেবে গঠিত হয় নারী উন্নয়নে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি মন্ত্রণালয়-মহিলা বিষায়ক মন্ত্রণালয়।

 

১৯৭৬ সালে জাতীয় মহিলা সংস্থা গঠিত হয় এই সংস্থার কার্যক্রম সুদঢ় করার লক্ষ্যে ১৯৯১ সালে জাতীয় মহিলা সংস্থা আইন প্রণীত হয়্ ১৯৮৪ সালে মহিলা বিষয়ক পরিদপ্তর গঠিত হয় এবং ১৯৯০ সালে পরিদপ্তর অধিদপ্তরে উন্নীত হয়। ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ের কর্মকৎপরতা তথা দায়িত্ব বৃদ্ধিপূর্বক মহিলাদের সাথে শিশু উন্নয়ন বিষয়টিও মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিধিভুক্ত করে ১৯৯৪ সালের মন্ত্রণালয়ের নামকরণ হয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে জাতয়ি মহিলা প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন একাডেমী, কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, নারীদের কৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় মহিলা সংস্থা এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর এর জেলা, উপজেলা দপ্তরসমূহের মাধ্যমে দেশব্যাপী নারী উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবাযন অব্যাহত রয়েছে। সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ও বিনোদন পরিমণ্ডলে শিশুদের সুপ্তপ্রতিভা বিকাশের উদ্দেশ্যে ১৯৭৬ সালে অধ্যাদেশ প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী প্রতিষ্ঠা করা হয় বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৬টি বিভাগের ৬টি উপজেলায় একাডেমী কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়েছে। একথা নির্দ্বিধায় বরা যায় যে, বাংলাদেশ শিশু একাডেমী কর্তৃক বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ও ভূমিকা গ্রহণের কারণে বাংলাদেশের শিশুরা সংস্কৃতি ও বিনো্দনমূলক ক্ষেত্রে তাদের স্বকীয়তা বিশ্ব শিশু পরিমন্ডলে পরিচিত করার কাজে সাফল্য অর্জন করেছে এবং দেশীয় পর্যায়েও সংস্কৃতি/বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে অকুণ্ঠ প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। শিশু একাডেমী থেকে প্রশিক্ষিত শিশু শিল্পীদের অনেকে জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরে মেধা ও মননের সমন্বয় ঘটিয়ে সম্মানজনক আসনে সমাসীন হয়েছে।

 

বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের সাথে নারী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমন্বিত করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়সমূহে ইউড ফোকাল পয়েন্ট মেকানিজম তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, নীতি নির্ধারণ ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন পর্যালোচনার জন্য গঠিত হয়েছে জাতীয় মহিলা উন্নয়ন পরিষদ। "নারী উন্নয়ন বাস্তবায়ন ও মূল্যায়ন কমিটি"। এছাড়া নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর সভাপতিত্বে রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি।

 

নারী উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে বেসরকারী পর্যায়ে কর্মরত বিভিন্ন এনজিও এবং নারী সংগঠনসমূহের সাথে আলোচনা/পর্যালোচনা/ মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরী ও আবশ্যক বিবেচিত হওয়ায় নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ের এবং জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটিতে সিভিল সোসাইটির সদস্যবর্গের প্রতিনিধিত্ব হয়েছে।

 

দ্বিতীয় অধ্যায়

 

২. জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য

 

উন্নয়নের মূলস্রোতধারার সকল স্তরে নারীকে সম্পৃক্ত করা ও তার সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির মূল লক্ষ্য। এছাড়াও জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য রয়েছে।

 

জাতীয় উন্নয়ন নীতির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যসমূহ

১.১ জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করা;

১.২ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;

১.৩ নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতায়ন নিশ্চিত করা;

১.৪ নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা;

১.৫ নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা;

১.৬ নারী সমাজকে দারিদ্রের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা;

১.৭ নারী পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন করা;

১.৮ সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে নারীর অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি প্রদান করা;

১.৯ নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূর করা;

১.১০ রাজনীতি, প্রশাসন ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে, আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া এবং পারিবারিক জীবনের সর্বত্র নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা;

১.১১ নারী-স্বার্থের অনুকূল প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও আমদানী করা এবং নারী-স্বার্থ বিরোধী প্রযুক্তি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা;

১.১২ নারীর সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা;

১.১৩ নারীর জন্য উপযুক্ত আশ্রয় ও গৃহায়ণ ব্যবস্থায় নারীর অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা;

১.১৪ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সশস্ত্র সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্থ নারীর পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা;

১.১৫ বিশেষ দুর্দশাগ্রস্থ নারীর চাহিদা পুলণের ব্যবস্থা করা;

১.১৬ বিধবা, অভিভাবকহীন, স্বাশী পরিত্যাক্ত, অবিবাহিত ও সন্তানহীন নারীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা;

১.১৭ গণমাদ্যমে নারী ও মেয়েশিশুর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরাসহ জেন্ডার প্রেক্ষিত প্রতিফলিত করা;

১.১৮ মেধাবী ও প্রতিভাময়ী নারীর সৃজনশীল ক্ষমতা বিকাশে সহায়তা করা;

১.১৯ নারী উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবা প্রদান করা।

 

তৃতীয় অধ্যায়

 

৩. নারীর মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ

 

৩.১ মানবাধিকার এবং মৌলিক স্বাধীনতা সকল ক্ষেত্রে, যেমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ যে সম-অধিকারী, তার স্বীকৃতি স্বরূপ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ করা;

৩.২ নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

৩.৩ নারীর মানবাধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইন সংশোধন ও প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা;

৩.৪ বিদ্যমান সকল বৈষম্যমূলক আইন বিলোপ করা এবং আইন প্রণয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে গঠিত কমিশন বা কমিটিতে নারী আইনজ্ঞদের অংগ্রহণ কনিশ্চিত করা;

৩.৫ স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোন ধর্মের, কোন অনুশাসনের ভুল ব্যাখ্যার বিত্তিতে নারী স্বার্থের পরিপন্থী এবং প্রচিলিত আইনবিরোধী কোন বক্তব্য বা অনুরূপ কাজ করা বা কোন উদ্যোগ না নেয়া;

৩.৬ বৈষম্যমূলক কোন আইন প্রণয়ন না করা বা সৈষম্যমূলক কোন সামাজিক প্রথার উন্মেষ ঘটতে না দেয়্;

৩.৭ গুণগত শিক্ষার সকল পর্যায়ে, চাকরিতে, কারিগরী প্রশিক্ষণে, সম-পারিতোষিকের ক্ষেত্রে কর্মরত অবস্থায় স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তায়, সামাজিক নিরাপ্ততা এবং স্বাস্থ্য পরিচর্যায় নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা;

৩.৮ মানবাধিকর ও নারী বিষয়ক আইন সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান ও সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি করা;

৩.৯ পিতা ও মাতা উভয়ের পরিচয়ে সন্তানেরর পরিচিতির ব্যবস্থা করা যেমন, জন্মনিবন্ধীকরণ, সকল সনদপত্র, ভোটার তালিকা, ফরম, চাকরির আবদেনপত্র, পাসপোর্ট ইত্যাদিতে ব্যক্তির নাম প্রদানের সময় পিতা ও মাতার নাম উল্লেখ করা।

 

৪. মেয়েশিশুর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সাধন এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা

 

৪.১ বাল্যবিবাহ, মেয়েশিশু ধর্ষন, নিপীড়ন, পাচার এবং পতিতাবৃত্তির বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ করা;

৪.২ পরিবারের মধ্যে এবং বাইরে মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্যহীন আচরণ করা এবং মেয়েশিশুর ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা;

৪.৩ মেয়েশিশুর চাহিদা যেমন, খাদ্য, পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও বৃত্তিমুলক প্রশিক্ষণের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা;

৪.৪ শিশুশ্রম, বিশেষ করে মেয়েশিশুশ্রম দূরীকরণ কর্মসূচী বাস্তবায়নের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা।

 

৫. নারীর প্রতি সকল নির্যাতন দূরীকরণ

 

৫.১ পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি শারীরিক, মানসিক ও যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ, পতিতাবৃত্তিতে নিয়োগ, যৌতুক ও নারীর প্রতি সহিংসতা দূর করা;

৫.২ নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্পর্কিত প্রচলিত আইন যুযোগযোগী করার লক্ষ্যে সংশোধন এবং নতুন আইন প্রণয়ন করা;

৫.৩ নির্যাতিত নারীকে আইনগত সাহয়তা করা;

৫.৪ নারীপাচার বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করা;

৫.৫ নারীর প্রতি নির্যাতন দূরীকরণ এবং এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগের জন্য বিচার ব্যবস্থায় পুলিশ বাহিনীর সর্বস্তরে বর্ধিত হারে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;

৫.৬ বিচার বিভাগ ও পুলিশ বিভাগকে নারীর অধিকার সংশ্লিষ্ট আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া ও জেন্ডার সংবেদনশীল করা;

৫.৭ নারী ও মেয়েশিশু নির্যাতন ও পাচার সম্পর্কীয় অপরাধের বিচার ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পন্ন করার লক্ষ্যে বিচার পদ্ধতি সহকতর করা।

 

৬. সশস্ত্র সংঘর্ষ ও নারীর অবস্থা

 

৬.১ সশস্ত্র সংঘর্ষ ও জাতিগত যুদ্ধে নারীর অধিকতর নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা;

৬.২ সংঘর্ষ বন্ধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা;

৬.৩ আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার মিশনে নারী প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা।

 

৭. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ

 

৭.১ নারী শিক্ষা বৃদ্ধি, নারী পুরুষের মধ্যে শিক্ষার হার ও সুযোগের বৈষম্য দূর করা এবং উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় নারীকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে সক্রিয় ও স্পষ্ট নীতি অনুসরণ করা;

৭.২ আগামী দশ বছরে নিরক্ষরতা দূর করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করা, বিশেষত মেয়েশিশু ও নারীসমাজের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া।

৭.৩ বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা;

৭.৪ মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা;

৭.৫ টেকসই উন্নয়ন ও অব্যাহত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে নারীর জন্য আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পগ্রহণ এবং শক্তিশালী করা;

৭.৬ শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী ও মেয়েশিশুর সমান অধিকার নিশ্চিত করা, শিক্ষার সকল পর্যায়ে অসমতা দূর করা, শিক্ষাকে সর্বজনীন করা, ভর্তির হার বৃদ্ধিসহ নিরক্ষরতা দূর করা এবং মেয়েশিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে;

৭.৭ জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে সকল স্তরের পাঠ্যক্রমে নারী-পুরুষ সমতা প্রেক্ষিত সংযোজন করা;

৭.৮ নারীর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল প্রশিক্ষণে নারীকে সমান সুযোগ দেয়া;

৭.৯ নারী ও মেয়েশিশুর প্রতি দৃষ্টি রেখে বিদ্যমান নীতিসমূহের খাতওয়ারী সময়ভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা;

৭.১০ কারিগরী প্রযুক্তিগত ও উচ্চশিক্ষাসহ সকল পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা।

 

৮. ক্রীড়া ও সংস্কৃতি

 

৮.১ ক্রীড়াক্ষেত্রে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;

৮.২ স্থানীয় পর্যায়ে নারীর জন্য পৃথক ক্রীড়া কমপ্লেক্স গড়ে তোলা;

৮.৩ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;

৮.৪ নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে নারীকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে সরকারী অনুদানের ব্যবস্থা করা।

 

৯. জাতীয় অর্থনীতির সকল কর্মকাণ্ডে নারীর সক্রিয় ও সমঅধিকার নিশ্চিতকরণ

 

৯.১ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং নারী পুরুষের মধ্যে বিরাজমান পার্থক্য দূর করা;

৯.২ অর্থনৈতিক নীতি (বাণিজ্যনীতি, মুদ্রানীতি, করনীতি প্রভৃতি) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করা;

৯.৩ নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি লক্ষ্য রেখে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে ও কর্মসূচিতে নারীর চাহিদা ও স্বার্থ বিবেচনায় রাখা;

৯.৪ সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতির প্রয়োগে বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রতিহত করার লক্ষ্যে নারীর অনুকূলে Safety Nets গড়ে তোলা;

৯.৫ সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া;

৯.৬ শিক্ষা পাঠ্যক্রম, বিভিন্ন পুস্তকাদিতে নারীর অবমূল্যায়ন দূরীভূত করা এবং নারীর ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরা;

৯.৭ নারী-পুরুষ শ্রমকিদের সমান মজুরী ও কর্মস্থলে নিরাপত্তা প্রদান এবং চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা;

৯.৮ নারীর অংশগ্রহণ প্রাতিষ্ঠানিকীকরনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠাতিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নারীর অবদানের স্বীকৃতি দেয়া;

৯.৯ জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান প্রতিফরণের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ সকল প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

৯.১০ সরকারের জাতীয় হিসাবসমূহে গার্হস্থ্য শ্রমসহ সকল নারীশ্রমের সঠিক প্রতিফলন নিশ্চিত করা;

৯.১১ নারী যেখানে অধিক সংখ্যায় কর্মরত আছেন সেখানে যাতায়াত ব্যবস্থা, বাসস্থান, বিশ্রামাগার, পৃথক প্রক্ষালনকক্ষ এবং দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

৯.১২ নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণ

৯.১২.১ দরিদ্র নারী শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধিকল্পে তাদের সংগঠিত করে ও প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন এবং বিকল্প অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ সৃষ্টি করা;

৯.১২.২ দরিদ্র নারীকে উৎপাদনশীল কর্মে এবং অর্থনৈতিক মূলধরায় সম্পৃক্ত করা;

৯.১২.৩ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষাসহ নারীর সকল চাহিদা পূরনের লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা;

৯.১২.৪ জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রযোজনীয় ব্যবস্থা সহায়তা দান ও অনুপ্রাণিত করা;

 

৯.১৩ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন

 

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জরুরী বিষয়াদি যথা : স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, জীবনব্যাপী শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, তথ্য, উপার্জনের সুযোগ, সম্পদ, ঋণ, প্রযুক্তি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত স্থাবর/অস্থাবর স্মপত্তির ক্ষেত্রে নারীর সমান সুযোগ এবং নিয়ন্ত্রণের অধিকার দেয়া এবং সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নতুন আইন প্রণয়ন করা;

 

৯.১৪ নারীর কর্মসংস্থান

 

৯১৪.১ শিক্ষিত ও নিরক্ষর উভয়শ্রেণীর নারীর জন্য কর্মসংস্থানের সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করা;

৯.১৪.২ চাকরির ক্ষেত্রে নারীর বর্ধিত নিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রবেশ পর্যায়সহ সকল ক্ষেত্রে কোটা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা;

৯.১৪.৩ সকল নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে সরকার অনুসৃত কোটা ও কর্মসংস্থান নীতির আওতায় চাকরির ক্ষেত্রে নারীকে সকল প্রকার সম-সযোগ প্রদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করা;

৯.১৪.৪ নারীউদ্যোক্তা শ্রেণী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ঋণদান কর্মসূচি গ্রহণ করা;

৯.১৪.৫ নারীর বর্ধিত হারে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, অবস্থান ও অগ্রসরমানতা বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ গড়ে তোলা;

৯.১৪.৬ নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল আইন, বিধি ও নীতির প্রয়োজনীয় সংস্কার করা;

৯.১৪.৭ বিদেশে শ্রম বাজারে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা;

 

৯.১৫ সহায়ক সেবা

 

সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সহায়ক সেবা যেমন- শিমু যত্ন সুবিধা, কর্মস্থালে শিশু দিবাযত্ন পরিচর্যা কেন্দ্র বৃদ্ধি, অক্ষম, প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ, অসহায়, নারীদের জন্য গৃহায়ণ, বৃদ্ধাশ্রম স্থাপন, স্বাস্থ্য, বিনোদনের ব্যবস্থা প্রবর্তন, সম্প্রসারণ এবং উন্নীত করা;