কিভাবে আইনের আশ্রয় নিবেন

কোন অপরাধ বা  ক্ষতি সংঘটনের পর বা আগে আপনি আইনের আশ্রয় গ্রহণ করতে পারেন। এই আশ্রয় গ্রহণ করতে হয় সাধারনত মামলা দায়েরের মাধ্যমে। মামলা দুই প্রকার । যেমন:


দেওয়ানী মামলার পর্যায়ক্রমিক ধাপসমূহ

আপনি যদি জমি জমা সংক্রান্ত কিংবা ভরণপোষণ বা দেনমোহর দাবীর জন্য কিংবা দাম্পত্য জীবন সম্পর্কিত কোনো প্রতিকার পেতে চান তাহলে আপনাকে  আপনার দাবীর কথা উল্লেখ করে এবং প্রতিকার চেয়ে একজন উকিলের মাধ্যমে একটি আরজি প্রস্তুত করে  প্রয়োজনীয় কোর্ট-ফি সহ সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলাটি দায়ের করতে হবে। তবে উল্লেখ্য যে

  • কোনো মামলার মুল্যমান যদি ১ (এক) টাকা থেকে ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ ) টাকা পর্যন্ত হয় তাহলে সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।

  • মামলার মুল্যমান যদি ২,০০,০০১ (দুই লক্ষ এক) টাকা থেকে ৪,০০,০০০ (চার লক্ষ ) টাকা পর্যন্ত হয় তাহলে সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।

  • কিন্তু মামলার মূল্যমান যদি ৪,০০,০০১ (চার লক্ষ এক) টাকা থেকে যেকোনো মূল্যের মামলার ক্ষেত্রে যুগ্ম জেলা আদালতে দায়ের করতে হবে।

তবে পারিবারিক মামলার ক্ষেত্রে (যেমন: ভরণপোষণ, দেনমোহর, দাম্পত্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, বিবাহ বিচ্ছেদ বা তালাক এবং অভিভাবকত্ব) পারিবারিক আদালতে ( প্রতিটি জেলার সহকারী জজ  আদালত) মামলা দায়ের করতে হবে

মামলা দায়েরের পর আরজি সংশোধনের সুযোগ আছে কি না

আপনি যদি কোনো মামলার বাদী হয়ে থাকেন এবং মামলা চলাকলীন সময়ে যদি মনে হয়  আপনার দাখিলকৃত আরজিটি সংশোধনের প্রয়োজন  তাহলে  আপনি মামলার স্বার্থে আদালতের অনুমতি নিয়ে ন্যায়সংগত উপায়ে শর্তসাপেক্ষে মামলার যেকোনো পর্যায়ে আরজিটি সংশোধন করতে পারবেন।

খন সমন ও নোটিশ জারী করতে হবে 

  • মামলা দায়ের করার পর বিবাদী পক্ষকে অবগত করার জন্য সমন ও নোটিশ প্রদান করতে হয়।

  • বিবাদীকে মামলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য এবং

  • উক্ত মামলাটিতে জবাব দাখিলের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়।

সমন ফেরত্সার পর কি করবেন

আপনি যদি কোনো মামলার বাদী হন তাহলে

  • বিবাদী পক্ষের  জবাব দাখিলের জন্য তারিখ ধার্য হবে।

  • সমন ফেরত্‍ আসার পর মামলার নির্দিষ্ট তারিখে আপনাকে আদালতে উপস্থিত হতে হবে।

  • কোনো কারণে আদালতে উপস্থিত হতে না পারলে অনুপস্থিতির উপযুক্ত কারণ উল্লেখ করে আবেদন দাখিল করতে হবে।

আপনি যদি কোনো মামলার বিবাদী হন তাহলে কি করবেন

  • জবাব দাখিলের জন্য ধার্য তারিখে আপনাকে উপস্থিত হয়ে জবাব দাখিল করতে হবে, অন্যথায় মামলাটির একতরফা ডিক্রি হতে পারে।

  • কোনো কারণে আদালতে উপস্থিত হতে না পারলে অনুপস্থিতির উপযুক্ত কারণ উল্লেখ করে আবেদন দাখিল করতে হবে।

বিবাদী একবার জবাব দেবার পর পুনরায় জবাব সংশোধন করে জবাব দিতে পারবেন কি না

  • যদি কোনো মামলার বিবাদী জবাব দাখিলের পর কোনো গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা কোনো কাগজ খুঁজে পান সেক্ষেত্রে বিবাদী মামলার যেকোনো পর্যায়ে আরজির জবাব সংশোধন করতে পারবেন।

একতরফা ডিক্রি কি  

  • যদি কোনো মামলায় সমন যথারীতি ভাবে জারী হয়ে থাকে এবং সমন পাবার পর বিবাদী মামলার জবাব দেবার জন্য অনুপস্থিত থাকেন, কিন্তু বাদী উপস্থিত থাকেন তাহলে উক্ত মামলাটির বাদীর পক্ষে যে ডিক্রি হয়ে থাকে তাকে এক তরফা ডিক্রি বলে।

একতরফা ডিক্রি হলে করণীয় কি

আপনি যদি কোনো মামলার বাদী হন তাহলে

  • কোনো মামলায় একতরফা ডিক্রি হয়ে থাকলে উক্ত একতরফা ডিক্রি জারীর জন্য ডিক্রি প্রদানকারী আদালতে আবেদন করতে হবে।

একতরফা ডিক্রি হলে ডিক্রি রদের জন্য অাবেদন করা যাবে কি

  • কোনো মামলায় একতরফা ডিক্রি হয়ে থাকলে উক্ত একতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে ডিক্রি প্রদানের তারিখ হতে ৩০ দিনের মধ্যে একতরফা ডিক্রি প্রদানকারী আদালতে একতরফা ডিক্রি রদের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

একতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে অাপিল

  • সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ অথবা যুগ্ম জেলা জজ কর্তৃক একতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা জজ আদালতে আপিল করতে পারবেন।

  • জেলা জজ আদালত কতৃর্ক প্রদত্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে অাপিল করতে পারবেন।

একতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে রিভিউ বা পূনর্বিবেচনা

একতরফা ডিক্রির বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে যে আদালত ডিক্রিটি প্রদান করেছেন সেই আদালতেই মামলাটি পূণর্বিবেচনা তথা রিভিউ এর জন্য আবেদন করতে পারবেন।

বিচার্য বিষয় নির্ধারণ বা ইস্যু গঠন

বিবাদী কর্তৃক জবাব দাখিল করা হলে আদালত মোকদ্দমাটির বিচার্য বিষয় বা ইস্যু গঠনের জন্য তারিখ ধার্য করবেন।

বানবন্দী ও জেরার জন্য কখন আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে

আপনি যদি বাদী অথবা বিবাদী পক্ষের সাক্ষী হয়ে থাকেন তাহলে মামলাটি যে আদালতে বিচারাধীন আছে সেই আদালতের সংশ্লিষ্ট বিচারক

  • আপনার নামে সমন নোটিশ দিবেন, উক্ত সমন নোটিশ পাবার পর আপনি নির্ধারিত তারিখে আদালতে উপস্থিত হয়ে মামলার ঘটনা সম্পর্কে বর্ননা করবেন তথা জবানবন্দী দিবেন।

  • বিবাদী পক্ষের নিযুক্ত আইনজীবী ইচ্ছা করলে সেই দিনই আপনাকে জেরা করতে পারবেন।

  • যদি সেদিন জেরা না করেন তাহলে জেরা করার জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক করে দিবেন এবং জেরার জন্য নির্ধারিত তারিখে জেরা হবে।

  • বিবাদী পক্ষের আইনজীবী ইচ্ছা করলে মামলার বিষয় বস্তু প্রমাণের স্বার্থে আবেদনের প্রেক্ষিতে সুনির্দিষ্ট বিষয়ের উপর পুনরায় বাদী পক্ষের আপনাকে পুনঃজেরা করতে পারবেন।

উপরোক্ত ধাপগুলির জন্য আপনাকে অবশ্যই মামলার ধার্য তারিখে উপস্থিত হয়ে মামলা সম্পর্কে সাক্ষ্য/ জেরার উত্তর দিতে হবে, যদি আপনি সাক্ষ্য দিতে উপস্থিত না হন তাহলে আপনার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট/গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হতে পারে।

মামলার বিষয়বস্তু প্রমাণের জন্য কোন কাগজপত্র উপস্থাপন করা যাবে কি

যদি কোনো আদালত মনে করেন মামলার বিষয়বস্তু প্রমাণের জন্য এই কোন কাগজপত্র বা দলিলাদি দেখার প্রয়োজন হলে আদালত যেকোনো পক্ষকে যে কোনো সময় উক্ত কাগজপত্র বা দলিলাদি আদালতে উপস্থাপনের জন্য সমন নোটিশ দিতে পারেন। যদি আদালত হতে আপনি কোনো নোটিশ পান তাহলে অবশ্যই উক্ত কাগজপত্র বা দলিলাদি আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।

এস.ডি (Settling date)

এই পর্যায়ে আদালত শুনানীর জন্য তারিখ নির্ধারণ করবেন।

চূড়ান্ত শুনানী বা P.H (Peremptory hearing)

  • এই পর্যায়ে মামলায় বাদীর সাক্ষ্য শুরু হয়।

  • জেরা ও বিবাদীর সাক্ষ্য এবং জেরা অনুষ্ঠিত হয়।

পরবর্তী শুনানী বা বক্রী শুনানী বা F.H (Further hearing)

শুনানী তথ্য সাক্ষ্য ও জেরা অসম্পূর্ণ থাকলে এই পর্যায়ে আদালত পরবর্তী শুনানী বা F.H এর জন্য তারিখ নির্ধারণ করবেন।

যুক্তিতর্ক (Argument)

সাক্ষ্য প্রমাণ সমাপ্তির পর পরবর্তী পদক্ষেপ হল যুক্তিতর্ক। এই পর্যায়ে মামলার সমর্থনে বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষ নিজ নিজ্ব পক্ষে বিজ্ঞ আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে।

রায় (Judgement)

মামলার সর্বশেষ পর্যায় হলো রায় ঘোষণা। আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে রায় ঘোষণা করবেন।

ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল

একটি মামলার রায় ঘোষণার পর মামলাটি যদি আপনার পক্ষে যায় তাহলে আপনার পক্ষে  সংশ্লিষ্ট আদালত হতে ডিক্রি প্রদান করবে। কিন্তু যদি কোনো মামলায় আপনার বিরুদ্ধে ডিক্রি হয় তাহলে আপনাকে উক্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিল করতে হবে ।

  • যদি কোনো মামলায় সহকারী জজ / সিনিয়র সহকারী জজ / যুগ্ম জেলা জজ কোনো ডিক্রি প্রদান করে এবং ডিক্রির মূল্য যদি ৫ লক্ষ টাকার উপরে না হয় তাহলে জেলা জজের নিকট ডিক্রি প্রদান করার তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে।

  • যদি মামলার মূল্য ৫ লক্ষ টাকার উপরে হয় তাহলে সরাসরি হাইকোর্টে  ডিক্রি প্রদান করার তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে।

  • যদি কোনো মামলায় কোনো জেলা জজ ডিক্রি প্রদান করে থাকেন তাহলে উক্ত ডিক্রির বিরুদ্ধে সরাসরি হাইকোর্টে ডিক্রি প্রদান করার তারিখ হতে ৯০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে।